ফিকহ

একই দিনে রোজা ও ঈদের মাসআলা (চাঁদ দেখার মাসআলা)

ইজহারুল ইসলাম বুধ, 27 মে, 2026
386

 

مسألة رؤية الهلال

চাঁদ দেখার মাসআলা



 

লেখক: শাইখুল হাদীস ফযলুর রহমান আল-আযমী, আযাদভিল, দক্ষিণ আফ্রিকা



 

অনুবাদ:
ইজহারুল ইসলাম

 



 

بسم الله الرحمن الرحيم

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রশ্ন

সম্মানিত মুফতি সাহেবের সমীপে, আল্লাহ তাঁকে হেফাযত করুন:

 

এটা কারো অজানা নয় যে, আমাদের যুগে ফেতনা রাতের বন্যার মতো এবং সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো এই ফেতনার আগুন নেভানো এবং এর চিহ্ন মুছে ফেলা। মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেছে - একদল বলছেন চাঁদ উদয়স্থলের (মাতলা') পার্থক্য গণনীয়, আরেক দল বলছেন এই পার্থক্য গণনীয় নয়। প্রত্যেক দলই নিজেদের মত নিয়ে সন্তুষ্ট।

 

আমরা সবাই জানি যে, দ্বীন ও ফিকহে আমাদের কিছু মূলনীতি ও বিধান রয়েছে। তাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ - এই জটিল মাসআলাগুলো স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিন, যাতে আমি সঠিক পথে চলতে পারি।

 

إِنَّ اللهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

 

"নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।"

 

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

প্রশ্ন ১

আজকাল এই বিষয়ে আলোচনা চলছে যে, রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা উচিত - বিশেষ করে আমাদের দেশে এবং সাধারণভাবে সারা বিশ্বে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? এই ঐক্য কি জায়েয? নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

প্রশ্ন ২

জোহানেসবার্গ ও কেপটাউনের মাতলা'র (চাঁদ উদয়স্থল) মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? এদেরকে কি দূরবর্তী গণ্য করব, নাকি নিকটবর্তী? তাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করা কি আমাদের জন্য জায়েয? শরীয়তে "নিকট" ও "দূর"-এর সংজ্ঞা কী? দলিলসহ জানাবেন।

প্রশ্ন ৩

শরীয়ত কি আমাদেরকে নিজেদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে বলেছে, নাকি অন্যদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? যদি অন্যদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে হয়, তাহলে দূরত্বের সীমা কতটুকু? কারণ সূর্য যখনই এক ডিগ্রি সরে যায়, তখন কোনো জাতির জন্য সেটা ফজরের সময়, কারো জন্য সূর্যোদয়, কারো জন্য সূর্যাস্ত, আর কারো জন্য মধ্যরাত। দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

প্রশ্ন ৪

প্রত্যেক জাতির জন্য কি নিজস্ব মাতলা' অনুসরণ করা ওয়াজিব? নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে যেমন প্রত্যেক জাতি নিজস্ব অবস্থা অনুযায়ী আমল করে, এখানেও কি তাই? মাতলা'র পার্থক্য কি গণনীয়?

 

যদি পূর্বে চাঁদ দেখা যায়, তারপর এক ঘণ্টা বা এক দিন পরে সেই খবর আমাদের কাছে পৌঁছে, তাহলে কি তাদের চাঁদ দেখা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে? একইভাবে পশ্চিমে চাঁদ দেখা গেলে এবং পরে খবর পৌঁছলে কি সেটা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক?

প্রশ্ন ৫

ইবনে রুশদের 'কাওয়ায়েদ' গ্রন্থে দূরবর্তী দেশগুলোতে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় হওয়ার উপর ইজমা' (ঐকমত্য) উল্লেখ করা হয়েছে। শরীয়তে "দূরবর্তী দেশ"-এর সংজ্ঞা কী?

প্রশ্ন ৬

আমাদের কিছু কিতাবের মূল পাঠে আছে যে, মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় নয়। কিন্তু তাদের কাছে ইফতার ও নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য গণনীয়। কেন ইফতার ও নামাযের সময়ে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয়, কিন্তু চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে গণনীয় নয়? এই বিষয়ে হুকুম, মূলনীতি ও বিধান কী?

প্রশ্ন ৭

প্রথম শতাব্দীগুলোতে মদীনাবাসীরা কি শামবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা রাখতেন? মক্কাবাসীরা কি ইয়েমেনবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? আন্দালুসবাসীরা কি খোরাসানবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? নজদবাসীরা কি মিসরবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী?

 

আমাদের কিতাবে কি এই বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা আছে? কেন পূর্বসূরিদের কাছ থেকে এই বিষয়ে কিছু আমাদের কাছে পৌঁছেনি? তাঁরা কীভাবে আমল করতেন? মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে মদীনা থেকে সানআ পর্যন্ত কীভাবে চাঁদ দেখার খবর পৌঁছাত? মক্কা থেকে বাহরাইন পর্যন্ত কীভাবে?

প্রশ্ন ৮

আমাদের দেশ বিস্তৃত - এর অক্ষাংশ, দিগন্ত ও মাতলা' ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের গবেষক আলেমগণ বলেছেন যে, প্রায় পাঁচশত মাইল দূরত্বে মাতলা'র পার্থক্য হয়। তাহলে এই মাসআলায় ঐক্য কীভাবে সম্ভব, যখন মাতলা' সম্পূর্ণ ভিন্ন, দূরত্ব অনেক বেশি এবং দিগন্তে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে?

 

তাহলে উম্মতের নিয়ম একীভূত করার পথ কী? এর দলিলই বা কী?

প্রশ্ন ৯

আমাদের অধিকাংশ কিতাবে আছে:

 

«لا يُصام يوم الشك»

 

"সন্দেহের দিনে রোযা রাখা যাবে না।"

 

সন্দেহের দিনের অর্থ কী - ভাষাগত ও শরয়ী দিক থেকে? আমাদের ফকীহদের কাছে সন্দেহের দিনের হুকুম কী?

 

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন:

 

«من صام يوم الشك فقد عصى أبا القاسم»

 

"যে ব্যক্তি সন্দেহের দিনে রোযা রাখল, সে আবুল কাসিমের অবাধ্যতা করল।"

 

এই নিষেধাজ্ঞা কেন এসেছে? সন্দেহের দিন কি রমযানের অন্তর্ভুক্ত নয়, যেমনটি কিছু মানুষ দাবি করে? এই হাদীসে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে?

প্রশ্ন ১০

সন্দেহের দিনে রোযা রাখা নিষেধ সংক্রান্ত হাদীস এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার মধ্যে সম্পর্ক কী - যদিও দুই দেশের  অনেক বেশি দূরত্ব থাকে?

 

আমাদের জন্য কি জায়েয যে, আমরা মাতলা'র পার্থক্য না মানার বিষয়ে আমাদের মাজহাবের কিছু আলিমদের মতামত অনুযায়ী আমল করি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের কথা ছেড়ে দিই - যাঁরা রমযানের সন্দেহযুক্ত দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করতেন?

 

তাহলে সন্দেহের দিনের অর্থ কী এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার অর্থ কী? এক্ষেত্রে কীভাবে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা সম্ভব?

প্রশ্ন ১১

মাসের মূল হলো ত্রিশ দিন পূর্ণ করা  এবং  ত্রিশের কমে মাস হওয়াটা আরেজী বা অস্থায়ী বিষয়। যদি জানা না থাকে তাহলে মূল অনুযায়ী মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করতে হবে। অর্থাৎ আকাশ  পরিষ্কার থাকলে চাঁদ দেখে মাস জানা যাবে, আর মেঘলা থাকলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ করে জানা যাবে।

 

কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

«صوموا و أفطروا لرؤيته فإن غم عليكم فأكملوا شعبان ثلاثين يوماً ثم صوموا»

 

"চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং ইফতার কর। যদি মেঘলা থাকে তাহলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ কর, তারপর রোযা রাখ।"

 

কারণ, মূল হলো মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়া। ফলে সুনিশ্চিৎ কারণ ছাড়া মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করা থেকে বিরত থাকার সুযোগ নেই। 

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فأفطروا فإن غم عليكم فاقدروا ثلاثين يوماً»

 

"যখন তোমরা চাঁদ দেখবে তখন রোযা রাখবে, আর যখন দেখবে তখন ইফতার করবে। যদি মেঘলা থাকে তাহলে ত্রিশ দিন হিসাব কর।"

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«لا تصوموا قبل رمضان و صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته فإن حالت دونه غياية فأكملوا ثلاثين يوماً»

 

"রমযানের আগে রোযা রেখো না। চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। যদি মেঘ বাধা দেয় তাহলে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।"

 

উল্লেখিত হাদীসগুলো এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার মধ্যে সম্পর্ক কী? জানা কথা যে, তিনি (আলাইহিস সালাম) বলেননি: "যদি মেঘলা থাকে তাহলে অন্যদের অনুসরণ কর।" অথবা যদি তোমাদের কাছে চাঁদ দেখা প্রমাণিত না হয় তাহলে তোমাদের জন্য অন্যদের চাঁদের অনুসরণ জ্বরুরি - এমনটি তিনি বলেননি। বরং তিনি বলেছেন:

 

«فإن غم عليكم فأكملوا شعبان ثلاثين يوماً ثم صوموا»

 

"যদি মেঘলা থাকে তাহলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ কর, তারপর রোযা রাখ।" এজাতীয় ভিন্ন ভিন্ন শব্দে হাদীস এসেছে।

 

এরপরও রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার পথ কী? যারা এই ঐক্যের পক্ষে, তাদের কাছে দলিল কী?

প্রশ্ন ১২

হাদীসগুলোতে এমন শব্দ পাওয়া যায় যেমন: "তোমরা দেখলে", "তোমাদের উপর", "রোযা রাখো", "ইফতার করো", "পূর্ণ করো", "হিসাব করো" - এই শব্দগুলোর অর্থ কী? হাদীসে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে?

 

তারা কি শুধু মদীনাবাসী? মক্কাবাসী? গ্রামবাসী ও পাহাড়ের অধিবাসী? হিজাযবাসী? আরব উপদ্বীপের অধিবাসী? নাকি সমগ্র বিশ্বের অধিবাসী?

 

তারা হিজাযবাসী নাকি সমগ্র বিশ্বের অধিবাসী - এর দলিল কী? নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

প্রশ্ন ১৩

গ্রাম, পাহাড়, মরুভূমি, বন ও মরুপ্রান্তরের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে - যেখানে বিদ্যুৎ, রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন ইত্যাদি আধুনিক মাধ্যম পৌঁছেনি - রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা কীভাবে সম্ভব?

 

এই লোকদেরকে কে আমাদের চাঁদ দেখার খবর দেবে এবং কে তাদের চাঁদ দেখার খবর আমাদের দেবে? তাদের জন্য কি আলাদা হুকুম আছে এবং আমাদের জন্য আলাদা? কীভাবে ঐক্য সম্ভব? এভাবে কী করে এই উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার আশা করা যায়?

প্রশ্ন ১৪

এই মাসআলায় শাফেয়ীদের মত কী? তারা কি মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় মনে করেন?

প্রশ্ন ১৫

মাতলা'র পার্থক্যের মাসআলায় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের কথা ও কাজের মধ্যে পার্থক্য কী?

প্রশ্ন ১৬

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন কুরাইবের কথা প্রত্যাখ্যান করলেন? তিনি বললেন: "এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী আদেশ করেছেন?

 

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন কুরাইবের কথা গ্রহণ করলেন না? সেই সময় মদীনায় কতজন সাহাবী ছিলেন এবং তাদের কেউ তাঁর প্রতিবাদ করেননি। বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সবাই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।

 

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কি জানতেন না যে, মাতলা'র পার্থক্য গ্রহযোগ্য নয়? যদি আমরা বলি মাতলা'র পার্থক্য গ্রহযোগ্য নয়, তাহলে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন রমযানের আগে চাঁদ দেখার জন্য শামে একটি অনুসন্ধানমূলক দল পাঠালেন না? এই মহান ইমাম ও বড় মুজতাহিদ কি উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার অর্থ জানতেন না এবং জানতেন না যে মাতলা'র পার্থক্য ধর্তব্য নয়?

 

এবং এটা কি আমাদের জন্য জায়েয যে, আমরা বলি কুরাইবের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, প্রত্যেক দেশের জন্য তার নিজস্ব চাঁদ দেখা জ্বরুরি - নিকট হোক বা দূর?

প্রশ্ন ১৭

যদি কেউ বলে: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুরাইবের কথা গ্রহণ করেননি কারণ চাঁদ দেখা সাক্ষ্যের অধ্যায় থেকে, খবরের অধ্যায় থেকে নয়। এর দলিল হলো যে, আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলেও একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। যদি এটা সাক্ষ্য হতো তাহলে গ্রহণ করা হতো না, কারণ সাক্ষ্যে সংখ্যা শর্ত।

 

আমি বলি: চাঁদ দেখার মাসআলা সাক্ষ্যের অধ্যায় থেকে নয়, বরং খবরের অধ্যায় থেকে। সংখ্যা দ্বীনী বিষয়ে খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত নয়, বরং শুধু আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) শর্ত - যেমন পানির পবিত্রতা ও অপবিত্রতা এবং এ জাতীয় বিষয়ে খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে। একইভাবে স্পষ্টত:  দাস ও নারীও খবর দেওয়ার যোগ্য।

 

আপনার কাছে অনুরোধ যে, এই সমস্ত মাসআলা স্পষ্ট ও পরিষ্কার বয়ানসহ ব্যাখ্যা করুন - আপনার দলিল ও উৎসসহ। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।

 

إِنَّ اللهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

 

"নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।"

 

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং তাঁর নেয়ামত থেকে জান্নাতে রিযিক দিন।

 

নিবেদক: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান, তাঁদের উভয়ের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক ২৫ রমযান মুবারক ১৪০৮ হি. P.O. Box Xo 2, Lanasia, 1820, South Africa

জবাব

( আল্লাহর সাহায্যে সঠিক পথ ও সত্যের তাওফীক চাই) :

জেনে রাখুন, আল্লাহ আমাকে ও আপনাকে সত্য ও সঠিক পথের তাওফীক দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে চাঁদ ও মাসের হুকুম দিয়েছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

«إذا رأيتموه فصوموا وإذا رأيتموه فأفطروا فإن غم عليكم فاقدروا له»

 

"যখন তোমরা তা (চাঁদ) দেখবে তখন রোযা রাখবে, আর যখন তা দেখবে তখন ইফতার করবে। যদি আকাশ মেঘলা থাকে তাহলে তার হিসাব কর।"

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته فإن أغمي عليكم فأكملوا عدة شعبان ثلاثين»

 

"চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। যদি আকাশ মেঘলা থাকে তাহলে শাবানের সংখ্যা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।"

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«الشهر تسع و عشرون ليلة فلا تصوموا حتى تروه فإن غم عليكم فأكملوا العدة ثلاثين»

 

"মাস উনত্রিশ রাত। চাঁদ না দেখে রোযা রেখো না। যদি আকাশ মেঘলা থাকে তাহলে সংখ্যা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।"

 

এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে, পৃ. ২৫৫ এবং এর পরে।

 

নাসায়ীর বর্ণনায় (পৃ. ৩০১):

 

«وإن شهد شاهدان فصوموا و أفطروا»

 

"যদি দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় তাহলে রোযা রাখ ও ইফতার কর।"

 

এই অর্থের হাদীস সহীহ গ্রন্থসমূহে ও অন্যান্য গ্রন্থে অনেক রয়েছে, তাই বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই।

 

এই হাদীসগুলোতে সম্বোধন সাধারণ - সকল উম্মত ও সকল মুসলমানকে অন্তর্ভুক্ত করে। এবিষয়ে ইজমা' (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত যে, রোযার জন্য প্রত্যেক মুসলমানের উপর পৃথকভাবে চাঁদ দেখা ওয়াজিব নয়, বরং কিছু মুসলমানের দেখাই যথেষ্ট।

 

হাদীসে কিছু মুসলমানকে অন্য কিছু মুসলমান ছাড়া নির্দিষ্ট করার কোনো দলিল নেই। যদি তাদের কেউ দেখে এবং অন্যদের কাছে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির খবরের মাধ্যমে অথবা দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যের মাধ্যমে (মতভেদ অনুযায়ী) অথবা সাক্ষ্যের উপর সাক্ষ্যের মাধ্যমে অথবা ইস্তিফাযা (ব্যাপক প্রচার) পদ্ধতিতে অথবা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে (যেমনটি ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে এবং ইমাম ও উলামাদের কাছে গ্রহণযোগ্য) প্রমাণিত হয়, তাহলে সবার জন্য রোযা ও ইফতার ওয়াজিব হবে।

 

নিকট ও দূর, মাতলা'র পার্থক্য বা না থাকা, এক মাসের দূরত্ব বা কম বা বেশি - এসব বিষয়ে হাদীসে কোনো বিস্তারিত বিবরণ নেই। যে এসব বিষয়ে বিস্তারিত দাবি করে, তার দায়িত্ব দলিল ও প্রমাণ দিয়ে তা সাব্যস্ত করা। উক্ত হাদীসের ব্যাপকতার উপর ততক্ষণ আমল করা হবে যতক্ষণ না এর বিপরীত সুস্পষ্ট  হাদীস বা ইজমা' পাওয়া যায়, যা উক্ত হাদীসকে ত্যাগ করতে বাধ্য করে। যদি এমনটি আবশ্যক হয়, তাহলে উক্ত বিশেষ হাদীস অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব এবং এই হাদীস থেকে প্রাপ্ত সাধারণ হুকুম ছেড়ে দিতে হবে।

 

উদাহরণস্বরূপ: যদি সৌদি আরবে চাঁদ দেখা যায় এবং সাক্ষীরা দক্ষিণ আফ্রিকায় সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করলে দক্ষিণ আফ্রিকায় মাস আটাশ দিন হওয়া জায়েয নয়। এমনটা হলে এর উপর আমল করা জায়েয নয়, কারণ এতে এমন হাদীস ত্যাগ করতে হয় যাতে স্পষ্ট আছে যে মাস উনত্রিশ বা ত্রিশ দিন হয়। আর  এ বিষয়ে ইজমা' প্রতিষ্ঠিত।

 

চাঁদ দেখার হাদীস থেকে প্রাপ্ত এই ব্যাপক হুকুম (অর্থাৎ যে কোন জায়গায় চাঁদ দেখা যাওয়া এবং উক্ত চাঁদ দেখার গ্রহণযোগ্য সংবাদ পৌঁছালেই চাঁদের বিধান সাব্যস্ত হওয়া) - এটাই হানাফীদের জাহিরুর রিওয়াত (ইমাম মুহাম্মাদ রহ: এর প্রসিদ্ধ ছয় কিতাব) এর মত। এর উপর ফতওয়া এবং অধিকাংশ মাশায়েখের মত। এর বিপরীতে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় নয় - যেমনটি হানাফী কিতাবসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।

 

রেফারেন্স:

 

  • তাবয়ীনুল হাকায়েক: ১/৩২১

  • আল-বাহরুর রায়েক, ইবনে নুজাইম: ২/২৭০

  • রদ্দুল মুহতার আশ-শামী: ২/৯৬ এবং অন্যান্য

 

এটি মালেকী ও হাম্বলীদের মতও। লাইস বিন সা'দ মিসরীও এই মত পোষণ করেন এবং কিছু শাফেয়ীও এই মতে গেছেন। (দেখুন: রদ্দুল মুহতার: ২/৯৬, ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩, মা'আরিফুস সুনান: ৫/৩১৫)

 

শাফেয়ীদের মত: যদি দেশগুলো কাছাকাছি হয় তাহলে হুকুম এক হবে। আর যদি দূরে হয় তাহলে শাফেয়ীদের মাঝে দুটি মত রয়েছে - চাঁদের বিধান সাব্যস্ত  হওয়া বা না হওয়া। ইমাম আবুত তাইয়্যেব ও একদল শাফেয়ী উলামায়ে কেরাম দূরের শহর হলেও চাঁদের বিধান সাব্যস্ত  হওয়ার মত বেছে নিয়েছেন। এটি ইমাম শাফেয়ীর দু’টি বক্তব্যের একটি। ইমাম  বাগাভী শাফেয়ী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।


 

কতটুকু দূরত্বে  চাঁদ এক জায়গায় দৃশ্যমান হলে অন্য জায়গায় তা সাব্যস্ত হবে, এটি নির্ধারণে বিভিন্ন মত রয়েছে:

 

  1. মাতলা' বা চাঁদের উদয়-স্থলের পার্থক্য

  2. কসরের দূরত্ব

  3. ইকলীমের (অঞ্চলের) পার্থক্য

  4. প্রত্যেক দেশের জন্য এমন দূরত্ব যেখানে সাধারণত তাদের খবর অন্যদের কাছে কোনো কারণ ছাড়া পৌঁছে না

  5. যে এলাকায় চাঁদ দৃশ্যমান হয়েছে শুধু সেখানকার অধিবাসীদের জন্য চাঁদের বিধান  সাব্যস্ত হবে, তবে যদি রাষ্টনায়ক বা খলিফার কাছে চাঁদের সংবাদ প্রমাণিত হয় এবং তিনি  সকল মানুষের জন্য সেটি বিধান জারী করেন, তাহলে তাদের জন্য এটি সাব্যস্ত ধরা হবে (ফাতহুল বারী: ৪/১২৩)

 

দেখুন কীভাবে তারা নিকট ও দূর নির্ধারণে মতভেদ করেছেন, কারণ তাদের কাছে এবিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল নেই। এক্ষেত্রে মূলত: তারা ধারণা ও ইজতিহাদের উপর নির্ভর করেছেন এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীস দিয়ে দলিল দিয়েছেন - যা ইনশাআল্লাহ প্রকাশ পাবে যে এর দ্বারা দলিল দেওয়া সঠিক নয়।

 

মূল কথা হলো, অধিকাংশ ইমাম ও উলামার কাছে মাতলা’ বা চাঁদের উদয়-স্থলের পার্থক্য গ্রহণযোগ্য নয়। হাদীসের দিকে তাকালে এটাই সঠিক। ইমাম ফখরুদ্দীন যাইলায়ী শরহুল কানযে যা বলেছেন: "মাতলা'র পার্থক্য গণনীয়" - এটা সম্ভবত হানাফী মাজহাবের জা’হিরুর রিওয়াতের  বিরোধী কোনো মত নয়, বরং এটা আমাদের ইমামদের থেকে সংক্ষেপে বর্ণিত মতের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা। আমাদের কাছে তাঁর উদ্দেশ্য (আল্লাহই ভালো জানেন) হলো সেই দূরবর্তী দেশ যেখানে সাক্ষ্য অনুযায়ী মাস সাতাশ বা আটাশ দিনের কম হয়ে যায়, অর্থাৎ এমন দূরবর্তী  দেশে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয়। যাইলায়ীর বক্তব্য এদিকেই ইঙ্গিত করে, তাই এটা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

 

এটাই শায়খ কাশ্মীরী রহ. তাঁর তিরমিযীর ভাষ্যে উদ্দেশ্য করেছেন, যেখানে তিনি বলেন:

 

ولا بد من تسليم قول الزيلعي و إلا لزم وقوع العيد يوم السابع و العشرين و الثامن و العشرين أو

 معارف السنن ٥ / ٣٣٧ . الحادي و الثلاثين و الثاني و الثلاثين


 

"যেসব অঞ্চলে ঈদ সাতাশ, আটাশ বা একত্রিশ, বত্রিশ তারিখে হবে সেসব ক্ষেত্রে যাইলায়ীর মত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।" (মা'আরিফুস সুনান: ৫/৩৩৭)

 

এটাই শায়খ শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.-এর গবেষণা, যেখানে তিনি বলেন:

 

«نعم ينبغي أن يُعتبر إختلافها إن لزم منه التفاوت بين البلدين بأكثر من يوم واحد لأن النصوص مُصرّحة بكون الشهر تسعة و عشرين أو ثلاثين فلا تُقبل الشهادة و لا يُعمل بها فيما دون أقل العدد و لا في أزيد من أكثره»

 

"হ্যাঁ, পার্থক্য গণনীয় হওয়া উচিত যদি এর ফলে দুই দেশের মধ্যে এক দিনের বেশি পার্থক্য হয়, কারণ নসগুলো (দলিলগুলো) স্পষ্ট যে আরবী মাস কেবল উনত্রিশ বা ত্রিশ দিন হয়। তাই সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না এবং এমন কিছুতে আমল করা যাবে না যা সর্বনিম্ন সংখ্যার চেয়ে কম এবং সর্বোচ্চ সংখ্যার চেয়ে বেশি (অর্থাৎ আরবী মাস ২৮ তারিখ কিংবা ৩১ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনা হলে স্বাক্ষ্য গ্রহণীয় হবে না) ।" (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩)

 

ইবনে আব্দুল বার মালেকী যা বলেছেন:

 

«أجمعوا على أنه لا تُراعى الرؤية فيما بَعُد من البلاد كخراسان و الأندلس»

 

"উলামায়ে কেরাম একমত যে খোরাসান ও আন্দালুসের মতো দূরবর্তী দেশ হলে এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের জন্য  প্রযোজ্য নয়।"

 

(সম্ভবত তাঁর অনুসরণে ইবনে রুশদ তাঁর কাওয়ায়েদে বলেছেন) - তারা একমত যে অনেক দূরবর্তী দেশে এক অঞ্চলের চাঁদ অন্য অঞ্চলের জন্য  প্রযোজ্য নয়। (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩)

 

ইবনে আব্দিল বার বা ইবনে রুশদের বক্তব্য আমাদের অবস্থানের বিরোধী নয়। কেননা তাদের বক্তব্যে দূরত্ব বলতে আসলে এমন দূরত্ব উদ্দেশ্য যেখানে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলে গ্রহণ করলে অনেক বেশি পার্থক্য তৈরি হয়। (অর্থাৎ মাস ২৮ বা ৩১ তারিখ হয়ে যায়)। তারা মূলত: পূর্ব-পশ্চিমের মতো অধিক দূরত্ব উদ্দেশ্য নিয়েছে, উত্তর - দক্ষিণের মতো দূরত্ব নয়। মূলকথা হলো, দু’ অঞ্চলের দূরত্ব যদি এমন হয় যে, আরবী মাস ২৮ বা ৩১ তারিখ হওয়া আবশ্যক হয়, তখন এটি সুস্পষ্ট হাদীস ও মুসলিম উম্মাহের ইজমা’ বিরোধী হওয়াই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এটাই আমাদের উত্তরের সার কথা। 


 

ইবনে আব্দিল বার যে বলেছেন, দূরবর্তী দেশে উদয়স্থলের পার্থক্য গ্রহণ করার বিষয়ে ইজমা হয়েছে, এ সম্পর্কে আল্লামা উসমানী রহ. বলেন:

 

«المراد من الإجماع إجماع أصحاب مالك رحمه الله على إعتبار إختلاف المطالع في البلدان  النائية»

 

 অনেক দূরবর্তী দেশে উদয়-স্থলের পার্থক্য গ্রহণীয় বিষয়ে  "ইজমা' বলতে আসলে  মালেকীদের ইজমা' বোঝানো হয়েছে। (সকল আলিমদের ইজমা নয়)।" (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩)

 

অন্যথায় (অর্থাৎ যদি এটা না হয়) তাহলে ইজমা'র দাবি তাদের উপর প্রত্যাখ্যাত, কারণ হানাফী, মালেকী ও হাম্বলীরা এর বিরোধী। (অর্থাৎ মৌলিকভাবে এধরণের ইজমার দাবীই আসলে ভুল)। 

 

শাওকানী বলেন:

 

«ولا يُلتفت الى ما قاله ابن عبد البر من أن هذا القول خلاف الإجماع لأن الإجماع لا يتم و المخالف مثل هؤلاء الجماعة»

 

"ইবনে আব্দুল বার যে ইজমা'র কথা বলেছেন তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না, কারণ ইজমা'-ই পূর্ণ হয় না যখন এতো এতো মাজহাবের লোকেরা এর বিরোধী থাকে।" (নাইলুল আওতার: ৪/২৬৯)


 

আমরা যে জবাব বেছে নিয়েছি তার দিকে ইবনে রুশদের নিচের বক্তব্য ইঙ্গিত করে, যেখানে তিনি বলেন:

 

«و أما إذا اختلفت إختلافاً كثيراً فليس يجب أن يُحمل بعضها على بعض»

 

"যদি দু’অঞ্চলের পার্থক্য অনেক বেশি হয় তাহলে একটির বিধান  অন্যটির উপর প্রয়োগ করা জ্বরুরি নয়।" (বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ১/২৮৮)

 

এরপর তিনি কুরাইবের হাদীস উল্লেখ করেছেন। এখানে অনেক বেশি পার্থক্য দ্বারা আসলে উল্লেখিত পার্থক্য উদ্দশ্য যেখানে মাস ২৮ বা ৩১ হওয়া আবশ্যক হয়। আর  কুরাইবের বর্ণনার পর্যালোচনা পরে উল্লেখ করছি ইনশা আল্লাহ। 

 

এই আলোচনার পর আপনাদের পত্রে উল্লেখিত প্রতিটি প্রশ্নের জবাব সংক্ষেপে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করব:

 

প্রশ্ন - ১:

আজকাল এই বিষয়ে আলোচনা চলছে যে, রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা উচিত - বিশেষ করে আমাদের দেশে এবং সাধারণভাবে সারা বিশ্বে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? এই ঐক্য কি জায়েয? নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

জবাব-১

হ্যাঁ, সম্ভব, কিন্তু খুবই কঠিন। উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা ওয়াজিব নয়, কারণ শরীয়ত আমাদেরকে এর আদেশ দেয়নি।

 

সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের সম্ভাবনাটিও শর্তযুক্ত 

 

- (১) যদি সমগ্র উম্মত একই শাসন ব্যবস্থার অধীন হয় 

- (২) অথবা উম্মত যদি একে - অপরের সাথে এমনভাবে যুক্ত থাকে যেখানে শরয়ী পদ্ধতিতে সকলের কাছেই সংবাদ পৌঁছে যায় তাহলে একই দিনে পালন করা যেতে পারে। তবে এই সংবাদ কিংবা সাক্ষ্য গ্রহণের  এর কারণে আরবী মাস ২৮ কিংবা ৩১ হতে পারবে না যা সুস্পষ্ট হাদীস ও উম্মাহের ইজমার বিরোধী।  উপরে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 



 

প্রশ্ন - ২

জোহানেসবার্গ ও কেপটাউনের মাতলা'র (চাঁদ উদয়স্থল) মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? এদেরকে কি দূরবর্তী গণ্য করব, নাকি নিকটবর্তী? তাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করা কি আমাদের জন্য জায়েয? শরীয়তে "নিকট" ও "দূর"-এর সংজ্ঞা কী? দলিলসহ জানাবেন।

 

জবাব ২

জোহানেসবার্গ ও কেপটাউনের মাতলা' আমাদের জন্য এক গণ্য করা সম্ভব, কারণ এর মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে তা উল্লেখিত তফাওত (পার্থক্য) সৃষ্টি করে না।

 

দূরত্ব ও নৈকট্যের পার্থক্য নির্ধারণের প্রকৃত কোন মানদন্ড কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়, এমনকি মুজতাহিদ ইমাম ও অন্যদের মতামত দ্বারাও নয়। এজন্যই দূর ও নিকটবর্তী শহর বা অঞ্চল নির্ধারণে শাফেয়ীদের বক্তব্যগুলো বেশ অগোছালো ও মতবিরোধপূর্ণ। ইতোপূর্বে এবিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজারের বক্তব্য উল্লেখ করেছি। বরং ইমাম নববী তো এক কিতাবে এক ধরণের মানদন্ডের কথা বলেছে আবার অন্য কিতাবে ভিন্ন কিছু বলেছেন। (ফাতহুল বারী খ: ৪, পৃ: ১২৩ দ্রষ্টব্য)


 

রদ্দুল মুহতারে (ফতোয়ায়ে শামী - তে) আছে: এক মাস বা তার বেশি সফরের দূরত্ব হলে মাতলা’ এর পার্থক্য ধর্তব্য হিবে। কুহিস্তানী জাওয়াহির থেকে সুলাইমান আলাইহিস সালামের ঘটনার ভিত্তিতে এটি ধর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন, কারণ তিনি প্রতিদিন সকাল - বিকাল এক ইকলীম (অঞ্চল) থেকে অন্য ইকলীমে স্থানান্তরিত হতেন এবং তাদের মধ্যে এক মাসের দূরত্ব ছিল ইত্যাদি।

 

ইবনে আবেদীন বলেন: "এই দলিলের দুর্বলতা কারও কাছে অস্পষ্ট নয়।" (রদ্দুল মুহতার: ২/৯৬)

 

আমি বলি: এধরণের দলিল অনেক সময় হাসির কারণ হবে।

 

শায়খ কাশ্মীরী রহ. বলেন:

 

«و حد البعد مُفوَّض الى الرأي المبتلى به و ليس له حد مُعيَّن و ذكر الشافعية في تحديده شيئاً»

 

"দূরত্বের সীমা ব্যক্তির অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর আসলে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। শাফেয়ীরা এর সীমা নির্ধারণে বিভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন।" (মা'আরিফুস সুনান: ৫/৩৩৭)

 

কাশ্মিরীর উল্লেখযোগ্য  ছাত্র ইউসুফ বানূরী  ফাতহুল বারী ও রদ্দুল মুহতার থেকে দূরত্বের সীমা সম্পর্কে বিভিন্ন মত নকল করার পর তাঁর ব্যাখ্যায় বলেন: "সমান্তরাল ও সমতল দিগন্তে পার্থক্যের কারণে সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা কঠিন। অক্ষাংশের পার্থক্য এবং দেশগুলোর উচ্চতা ও নিম্নতার তারতম্য মাতলা'র পার্থক্যে প্রভাব ফেলে। অনেক বিষয় আছে যা এর সীমা নির্ধারণে সমস্যা সৃষ্টি করে, ফলে মাতলার পার্থক্যের দূরত্ব নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা দেয়া কঠিন।" (ঐ: ৫/৩৪১)

 

আমাদের জন্য জায়েয যে, আমরা জোহানেসবার্গ ও কেপটাউনের মাতলা' এক গণ্য করি এবং ডারবানের মাতলা'ও এক গণ্য করি। যেমন আমাদের জন্য জায়েয যে, আমরা জোহানেসবার্গ ও নেলস্প্রুইটের (Nelspreit) মাতলা' এক গণ্য করি এবং মাফেকিং (Mafaking)-এর মাতলা'ও এক গণ্য করি। যদি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করব।

 

প্রশ্ন-৩

শরীয়ত কি আমাদেরকে নিজেদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে বলেছে, নাকি অন্যদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? যদি অন্যদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে হয়, তাহলে দূরত্বের সীমা কতটুকু? কারণ সূর্য যখনই এক ডিগ্রি সরে যায়, তখন কোনো জাতির জন্য সেটা ফজরের সময়, কারো জন্য সূর্যোদয়, কারো জন্য সূর্যাস্ত, আর কারো জন্য মধ্যরাত। দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

জবাব-৩

শরীয়ত আমাদেরকে মুসলমানদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে আদেশ করেছে। শরীয়ত আমাদের জন্য নিকট ও দূরের পার্থক্য স্পষ্ট করেনি। প্রশ্নে অন্যদের চাঁদ দেখা বলতে কী অন্য মুসলিমদের চাঁদ দেখা উদ্দেশ্য নিয়েছেন নাকি অন্য কিছু আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন - ৪

প্রত্যেক জাতির জন্য কি নিজস্ব মাতলা' অনুসরণ করা ওয়াজিব? নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে যেমন প্রত্যেক জাতি নিজস্ব অবস্থা অনুযায়ী আমল করে, এখানেও কি তাই? মাতলা'র পার্থক্য কি গণনীয়?

 

যদি পূর্বে চাঁদ দেখা যায়, তারপর এক ঘণ্টা বা এক দিন পরে সেই খবর আমাদের কাছে পৌঁছে, তাহলে কি তাদের চাঁদ দেখা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে? একইভাবে পশ্চিমে চাঁদ দেখা গেলে এবং পরে খবর পৌঁছলে কি সেটা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক?

জবাব-৪:

এর জবাব পূর্বের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট হয়েছে । চাঁদ দেখার মাসআলা ও নামাযের সময়ের মাসআলার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। কারণ, কিছু মুসলমানের চাঁদ দেখা যে মুসলমানরা চাঁদ দেখেনি তাদের জন্য রোযা বা ইফতার ওয়াজিব করে। কিন্তু নামাযের সময় এমন নয়, বরং প্রত্যেক মুসল্লীর জন্য যে স্থানে সে নামায পড়ছে সেখানকার সময় অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব।


 

প্রশ্ন-৫:

ইবনে রুশদের 'কাওয়ায়েদ' গ্রন্থে দূরবর্তী দেশগুলোতে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় হওয়ার উপর ইজমা' (ঐকমত্য) উল্লেখ করা হয়েছে। শরীয়তে "দূরবর্তী দেশ"-এর সংজ্ঞা কী?

জবাব - ৫:

এর জবাব পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন - ৬:

আমাদের কিছু কিতাবের মূল পাঠে আছে যে, মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় নয়। কিন্তু তাদের কাছে ইফতার ও নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য গণনীয়। কেন ইফতার ও নামাযের সময়ে মাতলা'র পার্থক্য গণনীয়, কিন্তু চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে গণনীয় নয়? এই বিষয়ে হুকুম, মূলনীতি ও বিধান কী?

জবাব - ৬:

হানাফী মাজহাবের প্রত্যেক কিতাবের মূল মতনে (যতদূর আমরা জানি) এবং তার শরাহগুলোতে উল্লেখ আছে যে, মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় নয় (কিছু কিছু কিতাবে এর বিপরীতটির কথাও  আপনি উল্লেখ করেছেন)। তবে  নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য গণনীয়। একইভাবে সন্ধ্যায় ও সূর্যাস্তের সময়ে রোযার ইফতারের ক্ষেত্রে পার্থক্য ধর্তব্য হবে, কারণ এক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি পৃথকভাবে তার সময়ে নামাজ আদায় ও ইফতারের ব্যাপারে আদিস্ট। যখন সে নামায পড়ে তখন সে যে স্থানে রয়েছে সে স্থানের সময় অনুযায়ী নামাজ আদায় করবে এবং সেই জায়গার ইফতারের সময় অনুযায়ী ইফতার করবে। তার জন্য অন্যের সময় যথেষ্ট নয়। এটা ইজমায়ী মাসআলা যা মুসলমানদের সর্বসম্মত আমলের মাধ্যমে প্রমাণিত। পৃথক দলিল আলোচনার  প্রয়োজন নেই।

 

চাঁদ দেখার মাসআলা এমন নয় - এটা ইজতিমায়ী (সামাজিক) মাসআলা। নামায ও ইফতার ইনফিরাদী (ব্যক্তিগত) মাসআলা।

 

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত: এক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: আমি চাঁদ দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন:

 

«يا بلال أذِّن في الناس أن يصوموا غداً»

 

"হে বেলাল, মানুষদের মধ্যে ঘোষণা দাও যে তারা যেন আগামীকাল রোযা রাখে।" (তিরমিযী: ২/৩৪০, তুহফাতুল আহওয়াযী সহ)

 

ইমাম মুহাম্মাদ তাঁর কিতাব 'আল-আসল'-এ বর্ণনা করেছেন: এক বেদুঈন মদীনায় এসে তাদের খবর দিল, এরপর তিনি উপরের বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। এখানে বেদুঈন অর্থ হলো মরুভূমির অধিবাসীদের একজন। (তুহফাতুল আহওয়াযী: ২/৩০৬)

 

"এসেছে", "উপস্থিত হয়েছে" ও "বেদুঈন" শব্দগুলোর প্রকাশ্য অর্থ হলো সে মরুভূমি থেকে এসেছে যা মদীনা মুনাওয়ারা নয়। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন  তার খবর জানাল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে  জিজ্ঞেস করেননি যে, সে মদীনায় চাঁদ দেখেছে নাকি এর বাইরে। এই হাদীস থেকে স্পষ্ট  যে, মদীনাবাসী ছাড়া অন্যদের চাঁদ দেখাও মদীনাবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক। নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে এমন নয় - যেমনটি স্পষ্ট।

 

এটা এমন একটি মূলনীতি ও উসূল যাতে ফিকহের অন্য কোন উসূল ও মূলনীতির সাথে কোন বিরোধ নেই। পরবর্তী আলোচনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। 

 

প্রশ্ন-৭:

প্রথম শতাব্দীগুলোতে মদীনাবাসীরা কি শামবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা রাখতেন? মক্কাবাসীরা কি ইয়েমেনবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? আন্দালুসবাসীরা কি খোরাসানবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী? নজদবাসীরা কি মিসরবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী?

 

আমাদের কিতাবে কি এই বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা আছে? কেন পূর্বসূরিদের কাছ থেকে এই বিষয়ে কিছু আমাদের কাছে পৌঁছেনি? তাঁরা কীভাবে আমল করতেন? মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে মদীনা থেকে সানআ পর্যন্ত কীভাবে চাঁদ দেখার খবর পৌঁছাত? মক্কা থেকে বাহরাইন পর্যন্ত কীভাবে?

জবাব - ৭:

 

হ্যাঁ, হাদীসের কিতাবসমূহে এমন অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে যে, তারা মদীনার বাইরে চাঁদ দেখে রোযা রেখেছেন বা ইফতার করেছেন।

 

আব্দুর রহমান বিন আবী লাইলা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বারা বিন আযেব ও উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে বাকী'তে চাঁদ দেখছিলাম। একজন আরোহী এলো। উমর তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কোথা থেকে এসেছ? সে বলল: মাগরিব (পশ্চিম) থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি চাঁদ দেখেছ? সে বলল: হ্যাঁ। উমর বললেন: আল্লাহু আকবার! মুসলমানদের জন্য একজন ব্যক্তিই যথেষ্ট। (আহমদ, দেখুন: নসবুর রায়াহ ২/৪৪৪)

 

রবী' বিন হিরাশ থেকে, আবু মাসউদ আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা ত্রিশ দিনের সকালে উপনীত হলাম। দুজন বেদুঈন এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাক্ষ্য দিল যে তারা গতকাল চাঁদ দেখেছে। তিনি মানুষদের রোজা ভাঙার করতে আদেশ দিলেন। (দারাকুতনী: ২/১৭১)

 

আবু বিশর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবু উমাইর বিন আনাসকে শুনেছি তাঁর আনসারী চাচাদের থেকে বর্ণনা করতে, রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাঁরা বলেন: দিনের শেষ ভাগে আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিলাম। তখন কিছু আরোহী এলো এবং সাক্ষ্য দিল যে তারা গতকাল চাঁদ দেখেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে রোজা ভাঙার আদেশ দিলেন এবং সকালে তাদের ঈদগাহে যেতে আদেশ দিলেন। (ঐ: ২/১৭০)

 

আব্দুর রহমান বিন আবী লাইলা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু চাঁদ দেখতে বের হলেন। একজন আরোহী এলো। উমর জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কোথা থেকে এসেছ? সে বলল: শাম থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি চাঁদ দেখেছ? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: আল্লাহু আকবার! মুমিনদের জন্য যথেষ্ট। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৩/১৪৯)

 

মূল বক্তব্যে ‘ইয়ালকাল মূ’মীনুন" শব্দ এসেছে । আমার ধারণা এটা "মুমিনদের জন্য যথেষ্ট" উদ্দেশ্য - যেমনটি আগে উল্লেখ হয়েছে। মূলত: এক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য একজন ব্যক্তিই যথেষ্ট। এই রেওয়ায়েত এটা সমর্থন করে।

 

যদি এই রেওয়ায়েতগুলো ও এর মতো রেওয়ায়েত কিতাবসমূহে নাও থাকত, তাহলে এতে কোনো সমস্যা বা অসুবিধা ছিল না। কারণ উল্লেখ না থাকা সংঘটিত না হওয়া আবশ্যক করে না। আমাদের জন্য আগে উল্লেখিত রেওয়ায়েতগুলোর সাধারণ অর্থই যথেষ্ট।

 

সালাফদের যুগে মুসলমানরা কি চাঁদ দেখা যাচাই করতে সফর করতেন, নাকি না? আমরা জানি না। যদি তারা সফর না করে থাকেন তাহলে তাদের উপর কোনো আপত্তি নেই, কারণ এটা তাদের উপর ওয়াজিব ছিল না। একইভাবে  এখনও এটা আমাদের উপরও ওয়াজিব নয়, তবে এটা মাকরূহ বা হারামও নয়।


 

প্রশ্ন - ৮:

আমাদের দেশ বিস্তৃত - এর অক্ষাংশ, দিগন্ত ও মাতলা' ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের গবেষক আলেমগণ বলেছেন যে, প্রায় পাঁচশত মাইল দূরত্বে মাতলা'র পার্থক্য হয়। তাহলে এই মাসআলায় ঐক্য কীভাবে সম্ভব, যখন মাতলা' সম্পূর্ণ ভিন্ন, দূরত্ব অনেক বেশি এবং দিগন্তে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে?

 

তাহলে উম্মতের নিয়ম একীভূত করার পথ কী? এর দলিলই বা কী?

 

জবাব ৮

আমাদের দেশ হিন্দুস্তানের মতো সত্যিই বিস্তৃত, যেমনটি শায়খ ইউসুফ বানূরী রহ. বলেছেন। একইভাবে পাকিস্তানও বিস্তৃত। কিন্তু শায়খ বানূরী রহ. পাকিস্তানে উলামাদের সাথে পাকিস্তানের মুসলমানদেরকে একই চাঁদের হুকুমে একীভূত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন চাঁদের মাসআলায় (যেমনটি আমি কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে শুনেছি)।

 

করাচি ও লাহোরের মধ্যে এবং করাচি ও পেশাওয়ারের মধ্যে দূরত্ব একেবারে কম নয়। যদি সেখানে এই ঐক্য জায়েয হয়, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীদের জন্য এক নিয়মে ঐক্যবদ্ধ হওয়া কেন জায়েয নয় - আর তাদের জন্য একই চাঁদে হুকুমে আসার উদ্দেশ্য সফর বৈধ হলে আমাদের  জন্য কেন বৈধ হবে না কেন?

 

আমাদের মাশায়েখদের মধ্যে মুহাক্কিকগণ যারা বলেছেন যে প্রায় পাঁচশত মাইল দূরত্বে মাতলা'র পার্থক্য হয় - তারা কারা? তাদের দলিল ও প্রমাণ-ই বা কী? যদি আপনারা আমাদেরকে এর দলিল ও উৎস জানান তাহলে আমরা আপনাদের কৃতজ্ঞ থাকব।


 

প্রশ্ন ৯

আমাদের অধিকাংশ কিতাবে আছে:

 

«لا يُصام يوم الشك»

 

"সন্দেহের দিনে রোযা রাখা যাবে না।"

 

সন্দেহের দিনের অর্থ কী - ভাষাগত ও শরয়ী দিক থেকে? আমাদের ফকীহদের কাছে সন্দেহের দিনের হুকুম কী?

 

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন:

 

«من صام يوم الشك فقد عصى أبا القاسم»

 

"যে ব্যক্তি সন্দেহের দিনে রোযা রাখল, সে আবুল কাসিমের অবাধ্যতা করল।"

 

এই নিষেধাজ্ঞা কেন এসেছে? সন্দেহের দিন কি রমযানের অন্তর্ভুক্ত নয়, যেমনটি কিছু মানুষ দাবি করে? এই হাদীসে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে?

জবাব ৯

সন্দেহের দিনে রোযা না রাখা সম্পর্কে অধিকাংশ কিতাবে যা আছে যে, তা হলো নফল ছাড়া রোযা রাখা যাবে না (আপনারা যেভাবে মৌলিকভাবে রোজা রাখা যাবে না লিখেছেন তা নয়)। ফিকহের কিতাবসমূহে সন্দেহের দিনের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ উল্লেখ আছে এবং ফকীহগণ এর বিধানও সেখানে আলোচনা করেছন। তাহলে আলাদাভাবে  প্রশ্নের উদ্দেশ্য কী? 

 

সন্দেহের দিনে রোযা রাখা হানাফীদের কাছে মুস্তাহাব, কিন্তু দৃঢ়ভাবে নফলের নিয়তে - রমযানের নিয়তে নয় এবং অন্য ওয়াজিবের নিয়তেও নয়। রমযান ও নফলের মধ্যে অথবা রমযান ও অন্য ওয়াজিবের মধ্যে দোদুল্যমান নিয়তেও নয়, কারণ এটা মাকরূহ।

 

এই দৃঢ়তা খাওয়াসদের (বিশেষ ব্যাক্তিদের) হয়ে থাকে - যেমন কাযী ও মুফতী। তাই তাদের জন্য মুস্তাহাব। আর আওয়ামদের (সাধারণ মানুষদের) অভ্যাস হলো তারা দোদুল্যমান থাকে, তাই তারা যাওয়ালের পর ইফতার করবে। কিন্তু তারা যাওয়ালের দিকে লক্ষ্য রাখবে।

 

এটাই আমাদের কিতাবসমূহে যা আছে তার সারাংশ। (দেখুন: নূরুল ঈযাহ, আল-কানয, শরহুল বিকায়াহ, আল-হিদায়াহ এবং অন্যান্য)

 

শায়খ কাশ্মীরী রহ. বলেন:

 

«ينبغي أن يُجعل أبو حنيفة رحمه الله مع أحمد لا مع الجمهور و قد صرّح صاحب الهداية بإستحباب الصوم عنده للخواص»

 

"আবু হানীফা রহ.-কে আহমদের সাথে রাখা উচিত, জমহুরের সাথে নয়। হিদায়ার লেখক খাওয়াসদের জন্য রোযা মুস্তাহাব হওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন।"

 

আর আম্মার রা: এর  হাদীসে যে নিষেধাজ্ঞার কথা রয়েছে তা এমন অবস্থায় প্রযোজ্য যখন পরিষ্কার আকাশে মানুষ কোনো কারণ ছাড়া সন্দেহ করে।

 

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন:

 

«يوم الشك ليس هو يوم الغيم فإنه يُستحب فيه الصوم و إنما هو يوم تردد فيه الناس بلا وجه»

 

""সন্দেহের দিন মেঘলা দিন নয়। আর এ দিনে রোযা মুস্তাহাব। বরং এটা সেই দিন যেদিন মানুষ কোনো কারণ ছাড়া দোদুল্যমান থাকে"

 

এবং এটাই সঠিক। (দেখুন: ফায়যুল বারী ৩/১৫১)

 

ইবনে আবেদীনও খাওয়াসদের জন্য মুস্তাহাব হওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন। (দেখুন: রদ্দুল মুহতার ২/৮৬)

 

মূল কথা হলো, আমাদের কাছে সন্দেহের দিনে রোযা মুস্তাহাব - সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের আমল অনুসরণে, কিন্তু তা দৃঢ়ভাবে নফলের নিয়তে হতে হবে - ফরযের নিয়তে নয়, অন্যথায় মাকরূহ হবে।

 

আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের নিষেধাজ্ঞা ফরযের নিয়তে রোযার উপর প্রযোজ্য অথবা ফরয ও নফলের মধ্যে দোদুল্যমান নিয়তে - যা আমাদের কাছে মাকরূহ। অথবা ইবনে তাইমিয়া যেটা বলেছেন, তার উপর প্রযোজ্য। শায়খ কাশ্মীরী রহ. ও তাঁর ছাত্র বানূরী রহ. এটাই পছন্দ করেছেন। (দেখুন: মা'আরিফুস সুনান ৫/৩৩২)

 

শক বা সন্দেহের শাব্দিক অর্থ হলো,  কোন কিছু সাব্যস্ত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি সমান হওয়া। ফকীহদের কাছে এর অর্থ হলো, আকাশ পরিষ্কার থাকলে শাবানের উনত্রিশ তারিখের পরের দিন। (দুররুল মুখতার: ৮৭/২, মা'আরিফুস সুনান: ৫/৩৩১)

 

কারো কাছে এটা মেঘলা দিনের সাথে সীমাবদ্ধ। (দুররুল মুখতার: ৮৭/২, মা'আরিফুস সুনান: ৫/৩৩১)


 

এটাই শায়খ কাশ্মীরী রহ.-এর কাছে উদ্দেশ্য - যেমনটি আগে উল্লেখ হয়েছে।

 

সতর্কতা: আপনারা লিখেছেন যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন: «من صام يوم الشك فقد عصى أبا القاسم» "যে ব্যক্তি সন্দেহের দিনে রোযা রাখল, সে আবুল কাসিমের অবাধ্যতা করল।"

 

কোন কিতাবে আপনারা এই হাদীস এই শব্দে দেখেছেন? সম্ভবত আপনারা মুখস্থের উপর নির্ভর করেছেন এবং ভুল করেছেন। এটা আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথা:

 

«من صام اليوم الذي شُكّ فيه فقد عصى أبا القاسم»

 

"যে ব্যক্তি সেই দিনে রোযা রাখল যেদিন সন্দেহ করা হয়েছে, সে আবুল কাসিমের অবাধ্যতা করল।"

 

তিরমিযী ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন। এটা মারফূ'র হুকুমে হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা নয়।

 

নিষেধাজ্ঞা এসেছে কারণ এতে রমযানকে এগিয়ে নেওয়া আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

«لا يتقدمن أحدكم رمضان بصوم يوم أو يومين إلا أن يكون رجل كان يصوم صومه فليصم ذلك اليوم»

 

"তোমাদের কেউ যেন রমযানকে এক বা দুই দিনের রোযা দিয়ে এগিয়ে না নেয়, তবে যদি কেউ তার নিয়মিত রোযা রাখে তাহলে সেই দিন রোযা রাখুক।" (বুখারী: ২৫৬ ও অন্যত্র)

 

তাই দৃঢ়ভাবে নফলের নিয়তে রোযা মাকরূহ নয়, কারণ এতে রমযানকে এগিয়ে নেওয়া হয় না। আর  সন্দেহের দিন রমযানের অংশ নয় - যেমনটি স্পষ্ট। আর হাদীসে সকল মুসলমানকে উদ্দেশ্য করে এটি বলা হয়েছে।


 

প্রশ্ন - ১০:

সন্দেহের দিনে রোযা রাখা নিষেধ সংক্রান্ত হাদীস এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার মধ্যে সম্পর্ক কী - যদিও দুই দেশের  অনেক বেশি দূরত্ব থাকে?

 

আমাদের জন্য কি জায়েয যে, আমরা মাতলা'র পার্থক্য না মানার বিষয়ে আমাদের মাজহাবের কিছু আলিমদের মতামত অনুযায়ী আমল করি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের কথা ছেড়ে দিই - যাঁরা রমযানের সন্দেহযুক্ত দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করতেন?

 

তাহলে সন্দেহের দিনের অর্থ কী এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার অর্থ কী? এক্ষেত্রে কীভাবে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা সম্ভব?

 

জবাব - ১০:

আমাদের মাযহাবের কিতাবসমূহ এই মাসআলার আলোচনা দিয়ে ভরা, অর্থাৎ: «ولا يُصام يوم الشك إلا نفلا» "সন্দেহের দিনে নফল  রোযা ছাড়া অন্য  রোজা রাখা যাবে না." (দেখুন: আল-জামে'উস সগীর, ইমাম মুহাম্মাদ রহ. থেকে নূরুল ঈযাহ পর্যন্ত)

 

আওয়াম যাওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে - যেমনটি আগে উল্লেখ হয়েছে। এই তাকিয়ে থাকা কেন? দুররুল মুখতারে আছে: অন্য কোন দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে। ৮৮/২

 

এই বক্তব্যটি স্পষ্টভাবে  প্রমাণ  করছে যে, মাতলা'র পার্থক্য ধর্তব্য নয়। এবং একথাও প্রমাণ করছে যে, প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের জন্য শুধু তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা নয়, বরং অন্য দেশের অধিবাসীদের চাঁদ দেখাও তাদের জন্য প্রযোজ্য। এটাই নিঃসন্দেহে হানাফীদের মাযহাব।

 

তাই জানা গেল যে, মাতলা’র পার্থক্য ধর্তব্য না হওয়ার মতটি হানাফী মাজহাবের কিছু আলিমের এমন নয়, বরং এটি অধিকাংশ আলিমের (জমহুর) মত। এর বিপরীতে যাইলায়ীসহ  অন্যদের বক্তব্যের সঠিক উদ্দেশ্য পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে এবং সন্দেহের দিনে রোযা নিষেধ সংক্রান্ত হাদীসের বিভিন্ন ব্যাখ্যাও উল্লেখ হয়েছে, তাই এগুলো পুনরায় দেখুন।


 

প্রশ্ন ১১

মাসের মূল হলো ত্রিশ দিন পূর্ণ করা  এবং  ত্রিশের কমে মাস হওয়াটা আরেজী বা অস্থায়ী বিষয়। যদি জানা না থাকে তাহলে মূল অনুযায়ী মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করতে হবে। অর্থাৎ আকাশ  পরিষ্কার থাকলে চাঁদ দেখে মাস জানা যাবে, আর মেঘলা থাকলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ করে জানা যাবে।

 

কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

«صوموا و أفطروا لرؤيته فإن غم عليكم فأكملوا شعبان ثلاثين يوماً ثم صوموا»

 

"চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং ইফতার কর। যদি মেঘলা থাকে তাহলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ কর, তারপর রোযা রাখ।"

 

কারণ, মূল হলো মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়া। ফলে সুনিশ্চিৎ কারণ ছাড়া মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করা থেকে বিরত থাকার সুযোগ নেই। 

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فأفطروا فإن غم عليكم فاقدروا ثلاثين يوماً»

 

"যখন তোমরা চাঁদ দেখবে তখন রোযা রাখবে, আর যখন দেখবে তখন ইফতার করবে। যদি মেঘলা থাকে তাহলে ত্রিশ দিন হিসাব কর।"

 

অন্য বর্ণনায়:

 

«لا تصوموا قبل رمضان و صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته فإن حالت دونه غياية فأكملوا ثلاثين يوماً»

 

"রমযানের আগে রোযা রেখো না। চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। যদি মেঘ বাধা দেয় তাহলে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।"

 

উল্লেখিত হাদীসগুলো এবং মাতলা'র পার্থক্য না মানার মধ্যে সম্পর্ক কী? জানা কথা যে, তিনি (আলাইহিস সালাম) বলেননি: "যদি মেঘলা থাকে তাহলে অন্যদের অনুসরণ কর।" অথবা যদি তোমাদের কাছে চাঁদ দেখা প্রমাণিত না হয় তাহলে তোমাদের জন্য অন্যদের চাঁদের অনুসরণ জ্বরুরি - এমনটি তিনি বলেননি। বরং তিনি বলেছেন:

 

«فإن غم عليكم فأكملوا شعبان ثلاثين يوماً ثم صوموا»

 

"যদি মেঘলা থাকে তাহলে শাবান ত্রিশ দিন পূর্ণ কর, তারপর রোযা রাখ।" এজাতীয় ভিন্ন ভিন্ন শব্দে হাদীস এসেছে।

 

এরপরও রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার পথ কী? যারা এই ঐক্যের পক্ষে, তাদের কাছে দলিল কী?


 

জবাব - ১১

«صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته»

 

"চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর" - হাদীসের অর্থ আগে উল্লেখ হয়েছে। এটা মাতলা'র পার্থক্য ধর্তব্য না হওয়ার দলিল। কারণ, এখানে ব্যাপকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। 

 

এমন কোনো হাদীস নেই যা এই হাদীসের সম্বোধনের ব্যাপকতাকে রহিত করে, তবে যদি এর কারণে মাস ২৮ বা ৩১ হয়,  তাহলে এটি ধর্তব্য হবে না। এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং ভালোভাবে বিষয়টি অনুধাবনের চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার জ্ঞানের পিপাসা আরও বাড়িয়ে দিন।


 

প্রশ্ন - ১২:

হাদীসগুলোতে এমন শব্দ পাওয়া যায় যেমন: "তোমরা দেখলে", "তোমাদের উপর", "রোযা রাখো", "ইফতার করো", "পূর্ণ করো", "হিসাব করো" - এই শব্দগুলোর অর্থ কী? হাদীসে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে?

 

তারা কি শুধু মদীনাবাসী? মক্কাবাসী? গ্রামবাসী ও পাহাড়ের অধিবাসী? হিজাযবাসী? আরব উপদ্বীপের অধিবাসী? নাকি সমগ্র বিশ্বের অধিবাসী?

 

তারা হিজাযবাসী নাকি সমগ্র বিশ্বের অধিবাসী - এর দলিল কী? নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিলসহ স্পষ্ট জবাব দিন।

জবাব - ১২:

 

"তোমরা দেখলে", "ইফতার কর" ও "পূর্ণ কর"-এর অর্থ স্পষ্ট - আর এখানে সম্বোধন সবার জন্য ব্যাপক। এই ব্যাপকতাকে নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলের জন্য বা কিছু লোকের জন্য খাস বা নির্দিষ্ট করার কোনো দলিল নেই। যে নির্দিষ্ট করার দাবি করে তার দায়িত্ব দলিল উপস্থাপন করা।

 

মূল কথা হলো,  যে চাঁদ দেখেছে অথবা শরয়ী গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে তার কাছে চাঁদ দেখার খবর পৌঁছেছে, তার জন্য এই খবর অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব - যেমনটি নাসায়ীর রেওয়ায়েত থেকে আগে উল্লেখ হয়েছে - চাঁদ দেখা ব্যক্তি থেকে নিকট হোক বা দূর।


 

প্রশ্ন - ১৩:

গ্রাম, পাহাড়, মরুভূমি, বন ও মরুপ্রান্তরের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে - যেখানে বিদ্যুৎ, রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন ইত্যাদি আধুনিক মাধ্যম পৌঁছেনি - রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করা কীভাবে সম্ভব?

 

এই লোকদেরকে কে আমাদের চাঁদ দেখার খবর দেবে এবং কে তাদের চাঁদ দেখার খবর আমাদের দেবে? তাদের জন্য কি আলাদা হুকুম আছে এবং আমাদের জন্য আলাদা? কীভাবে ঐক্য সম্ভব? এভাবে কী করে এই উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার আশা করা যায়?

জবাব - ১৩: 

উম্মতের নিয়ম একীভূত করা ওয়াজিব নয় এবং পাহাড় ও বনে খবর পৌঁছানোও ওয়াজিব নয়। কিন্তু যদি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌঁছে তাহলে আমল করা ওয়াজিব। যার কাছে পৌঁছেনি সে তার নিজের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করবে এবং এজন্য চাঁদ দেখার খবর সংগ্রহ করা তার উপর ওয়াজিব নয়, কারণ দ্বীনে কোনো কষ্ট নেই। ওয়াজিব ও জায়েযের মধ্যে পার্থক্য আপনার মতো ব্যক্তির কাছে গোপন নয়।


 

প্রশ্ন ১৪

এই মাসআলায় শাফেয়ীদের মত কী? তারা কি মাতলা'র পার্থক্য গণনীয় মনে করেন?

জবাব ১৪

শাফেয়ীদের মত আগে উল্লেখ হয়েছে, তাই দেখুন।

 

প্রশ্ন ১৫

মাতলা'র পার্থক্যের মাসআলায় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের কথা ও কাজের মধ্যে পার্থক্য কী?

জবাব ১৫

এর বিস্তারিত আগে উল্লেখ হয়েছে, পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই, তাই পুনরায় দেখুন।


 

প্রশ্ন ১৬

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন কুরাইবের কথা প্রত্যাখ্যান করলেন? তিনি বললেন: "এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী আদেশ করেছেন?

 

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন কুরাইবের কথা গ্রহণ করলেন না? সেই সময় মদীনায় কতজন সাহাবী ছিলেন এবং তাদের কেউ তাঁর প্রতিবাদ করেননি। বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সবাই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।

 

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কি জানতেন না যে, মাতলা'র পার্থক্য গ্রহযোগ্য নয়? যদি আমরা বলি মাতলা'র পার্থক্য গ্রহযোগ্য নয়, তাহলে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন রমযানের আগে চাঁদ দেখার জন্য শামে একটি অনুসন্ধানমূলক দল পাঠালেন না? এই মহান ইমাম ও বড় মুজতাহিদ কি উম্মতকে একই নিয়মে একীভূত করার অর্থ জানতেন না এবং জানতেন না যে মাতলা'র পার্থক্য ধর্তব্য নয়?

 

এবং এটা কি আমাদের জন্য জায়েয যে, আমরা বলি কুরাইবের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, প্রত্যেক দেশের জন্য তার নিজস্ব চাঁদ দেখা জ্বরুরি - নিকট হোক বা দূর?

প্রশ্ন ১৭

যদি কেউ বলে: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুরাইবের কথা গ্রহণ করেননি কারণ চাঁদ দেখা সাক্ষ্যের অধ্যায় থেকে, খবরের অধ্যায় থেকে নয়। এর দলিল হলো যে, আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলেও একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। যদি এটা সাক্ষ্য হতো তাহলে গ্রহণ করা হতো না, কারণ সাক্ষ্যে সংখ্যা শর্ত।

 

আমি বলি: চাঁদ দেখার মাসআলা সাক্ষ্যের অধ্যায় থেকে নয়, বরং খবরের অধ্যায় থেকে। সংখ্যা দ্বীনী বিষয়ে খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত নয়, বরং শুধু আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) শর্ত - যেমন পানির পবিত্রতা ও অপবিত্রতা এবং এ জাতীয় বিষয়ে খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে। একইভাবে স্পষ্টত:  দাস ও নারীও খবর দেওয়ার যোগ্য।

 

আপনার কাছে অনুরোধ যে, এই সমস্ত মাসআলা স্পষ্ট ও পরিষ্কার বয়ানসহ ব্যাখ্যা করুন - আপনার দলিল ও উৎসসহ। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।

 

إِنَّ اللهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

 

"নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।"

 

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং তাঁর নেয়ামত থেকে জান্নাতে রিযিক দিন।

 

জবাব ১৬, ১৭

প্রথমে কুরাইবের রেওয়ায়েত উল্লেখ করব, তারপর এর উপর আলোচনা করব:

 

কুরাইব থেকে বর্ণিত যে, উম্মুল ফযল বিনতে হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে শামে পাঠালেন। তিনি বলেন: আমি শামে গেলাম এবং তার কাজ সম্পন্ন করলাম। আমি শামে থাকতেই রমযান শুরু হলো এবং আমি জুমার রাতে চাঁদ দেখলাম। তারপর মাসের শেষে মদীনায় ফিরে এলাম।

 

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এবং চাঁদের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ? আমি বললাম: জুমার রাতে দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি নিজে দেখেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, এবং মানুষও দেখেছে। তারা রোযা রেখেছে এবং মুআবিয়াও রোযা রেখেছেন।

 

তিনি বললেন: কিন্তু আমরা শনিবার রাতে দেখেছি। তাই আমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ করব অথবা চাঁদ দেখব। আমি বললাম: মুআবিয়ার চাঁদ দেখা ও রোযা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন: না, এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন। (মুসলিম, ফাতহুল মুলহিম সহ: ৩/১১২)

 

এই কুরাইবের বর্ণনা বারবার পড়ুন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কেন কুরাইবের খবর প্রত্যাখ্যান করলেন?

 

তিনি নিজে থেকে কুরাবের বক্তব্য প্রত্যাখ্যানের কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি, বরং সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে বলেছেন: "এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন।" এখানে তার বক্তব্যে যে রয়েছে, ‘এভাবেই’- এই কথার উদ্দেশ্য কী?

 

স্পষ্টত:  তাঁর এই কথার উদ্দেশ্য হলো তাঁর পরবর্তী বক্তব্য:

 

«فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين أو نراه»

 

"আমরা রোযা রাখতে থাকব যতক্ষণ না ত্রিশ দিন পূর্ণ করি অথবা চাঁদ দেখি।"

 

কারণ এছাড়া অন্য কিছু তাঁর কথায় উল্লেখ নেই, তাহলে কীভাবে এর বাইরে অন্য কিছু তার কথার উদ্দেশ্য হবে?

 

তার বক্তব্যে মূলত:  শায়খাইন (বুখারী ও মুসলিম) ও অন্যরা যা বর্ণনা করেছেন  সেদিকে ঈঙ্গিত করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

«صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته فإن أغمي عليكم فأكملوا العدة ثلاثين»

 

"চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। যদি তোমাদের উপর মেঘলা থাকে তাহলে সংখ্যা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।" (বুখারী: ২৫৬, আবু হুরায়রা ও ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে। নাসায়ী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেও বর্ণনা করেছেন।)

 

এই মারফূ' হাদীস দিয়ে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুরাইবের খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কীভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন? এই হাদীস কি প্রমাণ করে যে প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা জ্বরুির? ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এটি স্পষ্টভাবে বলেননি আর  হাদীসটিও স্পষ্টভাবে এটি প্রমাণ করে না। 

 

বরং শাফেয়ীরা এভাবে ধারণা করেছে যে,  ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুরাইবের খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন কারণ কুরাইব মদীনা ছাড়া অন্য জায়গার খবর দিয়েছেন - যেমনটি তিরমিযী এই হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন: "অধ্যায়: প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে"

 

ইমাম তিরমিযীর কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা: প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা কোথা থেকে এলো? আপনি কুরাইবের খবর ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার প্রত্যাখ্যান থেকে হয়ত এমনটি বুঝেছেন। এটা আপনার ধারণা ও বোঝ আর কারো ধারণা অন্যের উপর হুজ্জত (দলিল) নয় - যেমনটি স্পষ্ট। এ বিষয়ে প্রত্যেক শহরের লোকের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখার কথা   ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কথায় নেই এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায়ও নেই।

 

ইমাম নববী রহ. মুসলিমের শরাহে এই শব্দে মন্তব্য করেছেন:

 

بَيَانُ أَنَّ لِكُلِّ بَلَدٍ رُؤْيَتَهُمْ وَ أَنَّهُم إِذَا رَأَوُا الهِلَالَ بِبَلَدٍ لَا يَثْبُتُ حُكْمُهُ لِمَا بَعُدَ عَنْهُم

 

"এই বিষয়ের বর্ণনা যে, প্রত্যেক দেশের (বাসিন্দাদের) জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখাই প্রযোজ্য এবং তারা যদি কোনো একটি দেশে চাঁদ দেখে, তবে যে স্থানটি তাদের থেকে দূরে অবস্থিত, সেখানে তার বিধান কার্যকর হবে না।"

 

দেখুন কীভাবে তিনি দূরত্বের শর্ত দিয়েছেন আর  ইমাম তিরমিযী এধরণের শর্ত ছাড়া ব্যাপকভাবে বলেছেন। আর এভাবে তাদের বক্তব্যের মাঝে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। কারণ, এগুলো তাদের নিজস্ব বুঝ ও ধারণা।  আর প্রত্যেকের নিজস্ব ধারণা থাকে, কিন্তু এটা অন্যের উপর হুজ্জত হয় না।

 

কাযী ইয়ায রহ. বলেন:

 

«وعدم إعتداده برؤية معاوية رضي الله عنه يحتمل أنه بناءً على مذهبه أن لكل قوم رؤيتهم أو لأنه لم يقبل خبر الواحد لأمر كان يعتقد في ذلك أو لإختلاف أفقهم، و قيل لأن السماء كانت بالمدينة مصحية فلما لم يروه إرتابوا في الخبر»

 

"তিনি মুআবিয়ার চাঁদ দেখা গ্রহণ করেননি সম্ভবত এই কারণে যে, তাঁর মতে প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা প্রযোজ্য, অথবা তিনি একজনের খবর গ্রহণ করেননি একজনের খবর গ্রহণ না করার বিষয়ে তার হয়ত কোন মতামত রয়েছে, অথবা তাদের দিগন্তের পার্থক্যের কারণে। কেউ কেউ বলেছেন, সেসময় মদীনায় আকাশ পরিষ্কার ছিল কিন্তু তারা চাঁদ দেখেনি তাই তিনি কুরাইবের খবরে সন্দেহ করেছেন।" (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩)

 

এগুলো বিভিন্ন রকম সম্ভাবনা যার কোনোটিই নিশ্চিত নয় এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এর কোনটিই নির্দিষ্টভাবে  বর্ণিত হয়নি। তাহলে কীভাবে এই সম্ভাবনাগুলো দিয়ে দলিল দেওয়া জায়েয? কীভাবে আমাদের জন্য জায়েয যে আমরা দৃঢ়ভাবে বলি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কুরাইবের খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন কারণ তাঁর মাযহাব হলো প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের জন্য তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখা?

 

এধরণের ক্ষেত্রে বলা হয়: "যখন সম্ভাবনা আসে তখন দলিল বাতিল হয়ে যায়।" আল্লাহই প্রকৃত অবস্থা ভালো জানেন।


 

যদি ধরে নিই যে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মাযহাব এটাই ছিল এবং তিনি এজন্যই কুরাইবের খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাহলে প্রশ্ন হলো: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এই মাযহাব কোথা থেকে নিলেন?

 

সম্ভবত তিনি সেই হাদীস থেকে নিয়েছেন যা আমরা বুখারী ও অন্যান্য থেকে উল্লেখ করেছি, অর্থাৎ: «صوموا لرؤيته و أفطروا لرؤيته» "চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর" ইত্যাদি। এটা তাঁর ইজতিহাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এবং এটি মারফূ' হাদীসের বিরুদ্ধে হুজ্জত নেই। হাদীস ব্যাপকতা ও মাতলা'র পার্থক্য না মানার উপর অধিক দলিল - যেমনটি আগে উল্লেখ হয়েছে।

 

কাজী শাওকানী বলেন:

 

«إعلم أن الحجة إنما هي في المرفوع من رواية ابن عباس رضي الله عنهما لا في إجتهاده الذي فهم عنه الناس»

 

"জেনে রাখুন যে, হুজ্জত শুধু ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার রেওয়ায়েতের মারফূ' অংশে, তাঁর ইজতিহাদে নয় যা মানুষ তাঁর থেকে বুঝেছে।"

 

তাঁর কথা "এভাবেই আমাদের আদেশ করেছেন" দ্বারা যা ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো তাঁর বাণী: «فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين» "আমরা রোযা রাখতে থাকব যতক্ষণ না ত্রিশ দিন পূর্ণ করি।"

 

আর এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট আদেশ হলো সেই হাদীস যা শায়খাইন ও অন্যরা যা বর্ণনা করেছেন:

 

«لا تصوموا حتى تروا الهلال و لا تفطروا حتى تروه فإن غم عليكم فأكملوا العدة ثلاثين»

 

"চাঁদ না দেখে রোযা রেখো না এবং চাঁদ না দেখে ইফতার করো না। যদি তোমাদের উপর আকাশ মেঘলা থাকে তাহলে সংখ্যা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর।"

 

এটা কোনো এলাকার অধিবাসীদের জন্য পৃথক ভাবে নির্দিষ্ট নয়, বরং এটা ব্যাপক সম্বোধন যা মুসলমানদের মধ্যে যারা এর যোগ্য তাদের সবার জন্য। তাই এটি এক দেশের অধিবাসীদের চাঁদ দেখা অন্য দেশের অধিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ার ব্যাপারে অধিক স্পষ্ট। এর বিপরীতে এক দেশের চাঁদ অন্য দেশের জন্য দলিল না হওয়ার চেয়ে । কারণ যদি এক দেশের অধিবাসীরা চাঁদ দেখে তাহলে তা মুসলমানরা দেখেছে। ফলে তাদের চাঁদ দেখা অন্যদের জন্যও আবশ্যক হবে।

 

যদি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কথার ঈঙ্গিত থেকে এক দেশের চাঁদ অন্য দেশের জন্য আবশ্যক নয়, এটা ধরে নেয়া হয়,  তাহলে এটি কোন একটি যৌক্তিক দলিল দিয়ে বিশেষায়িত হবে। আর সেটা হলো: দুই অঞ্চলের মধ্যে এমন দূরত্ব থাকা যেখানে মাতলা'র পার্থক্য হয়ে থাকে। অথচ এখানে শাম ও মদীনার মাঝে মাতলা’র পার্থক্য পরিমাণ দূরত্ব না থাকার পরও  ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা শামবাসীদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করেননি। এটি আসলে তার এমন ইজতিহাদ যা আসলে মৌলিকভাবে দলিল নয়। 

 

আর যদি এখানে কোন যৌক্তিক দলিল দ্বারা দু’অঞ্চলকে পৃথক ধরা না হয়,  তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে সব দলিল একথা নি:সন্দেহে প্রমাণ করে যে, বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীরা একে অপরের খবর ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে সকল শরয়ী বিধানে আমল করে এবং চাঁদ দেখাও এর অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের মধ্যে এমন দূরত্ব থাকুক যেখানে মাতলা'র পার্থক্য হয় অথবা না থাকুক। নির্দিষ্টকরণের পৃথক দলিল ছাড়া উভয় অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য গ্রহণযোগ্য নয়। (নাইলুল আওতার: ৪/১১৩)

 

এটা আমার কাছে সুন্দর একটি আলোচনা এবং শায়খ মুহাক্কিক শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ. এর অধিকাংশ নকল করেছেন। (দেখুন: ফাতহুল মুলহিম ৩/১১৩ এবং তিনি এর প্রতিবাদ করেননি বরং সম্মতি দিয়েছেন।)

 

এই বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, যারা মাতলা'র পার্থক্য গ্রহণযোগ্য বলেন এবং কুরাইবের এই হাদীস দিয়ে দলিল দেন, তাদের জন্য এই হাদীসে কোনো হুজ্জত নেই। আর কাজী শাওকানীর কথা এদিকেও ইঙ্গিত করে যে, মদীনা মুনাওয়ারা ও শামের মধ্যে এমন দূরত্ব নেই যা মাতলা’র পার্থক্য সৃষ্টি করে। আর এটি বাস্তবেও স্পষ্ট একটি বিষয়।

 

কুরাইবের হাদীসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর জওয়াব দিয়েছেন শায়খ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ. এবং তাঁর ছাত্র শায়খ কাশ্মীরী রহ. ও উসমানী রহ. উভয়ে তার থেকে এটি নকল করেছেন। এখানে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার উদ্দেশ্য কুরাইবের সাক্ষ্য রোজা সাব্যস্তের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে শুধু কুরাইব এর সাক্ষ্য যথেষ্ট নয়।  যেমনটি তাঁর কথা থেকে স্পষ্ট:

 

«فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين أو نراه»

 

"আমরা রোযা রাখতে থাকব যতক্ষণ না ত্রিশ দিন পূর্ণ করি অথবা চাঁদ দেখি।"

 

এটা অন্য একটি মাসআলা (এটা আমাদের আলোচিত মাসআলা নয় এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে হাদীসটি আমাদের আলোচিত মাসআলার সাথে সম্পর্কিতও নয়)

 

হানাফী আলিমদের এবিষয়ে মতবিরোধ  হয়েছে যেমনটি দুররুল মুখতারে আছে: যদি তারা ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কথায় রোযা রাখা শুরু করে এবং চাঁদ অস্পষ্ট থাকে তাহলে হানাফী মাজহারের ফতোয়া হলো, এক্ষেত্রে রোজা ভঙ্গ করা  জায়েয নয় । ইমাম মুহাম্মাদ রহ: এর মাজহাব এর বিপরীত। (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৪)

 

এসব আলোচনার  পর এটি স্পষ্ট যে, এই হাদীস দিয়ে মাতলা’র পার্থক্যের উপর দলিল দেওয়া সঠিক নয়, কারণ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। আল্লাহই ভালো জানেন।

যারা এই বর্ণনা দিয়ে দলিল দেন যে, এক মাস বা তার বেশি দূরত্বে কিংবা পাঁচ শ’ মাইল দূরত্বে এক শহরের  চাঁদ দেখা অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়, তারা এর দ্বারা নিজেদের বিরুদ্ধে দলিল দিচ্ছেন। কারণ কুরাইব রমযানের শেষে মদীনা মুনাওয়ারায় উপস্থিত হয়েছেন এবং তিনি রমজানের শুরুতে মানুষদের সাথে শামে চাঁদ দেখে রোজা শুরু করেছেন। তাই জানা গেল যে, এখানে দূরত্ব এক মাসের কম ছিল। এতদসত্ত্বেও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তার খবর বা সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাই স্পষ্ট হলো যে, প্রত্যাখ্যানের কারণ দূরত্ব এক মাসের বেশি হওয়া নয়, বরং অন্য কিছু ছিল যা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মনে ছিল এবং তিনি তা স্পষ্ট করেননি। এটাই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য জবাব। আল্লাহই সঠিক বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন।

ফযলুর রহমান আল-আযমী আযাদভিল, যুল হিজ্জা ১৪০৮ হি."

 

লেখকরে পূর্ন-পরিচয়: https://al-miftah.com/a-brief-biography-of-my-honourable-teacher-shaykhul-hadith-moulana-fadlur-rahman-azmi/

 

লেখকের বিস্তারিত জীবনী: https://ia601507.us.archive.org/25/items/akabir/ShaykhAl-hadithFazlurRahmanAzmiByMuftiAtiqurRahmanAzmi.pdf

 

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 1

আপনার মন্তব্য জানান
আখতার হুসাইন সরকার 15 hours,41 minutes আগে

ইজহার ভাই মেধাবী মানুষ।
তার প্রতিটি লেখা গভীর গবেষণাধর্মী।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 351
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 327
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 973
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 408