ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম শুক্র, 13 মার্চ, 2026
383

পূর্ব কথা:

আমাদের দেশের অধিকাংশ মসজিদে খতম তারাবী হয়ে থাকে। দীর্ঘ এক মাস যাবৎ হাফেজ সাহেবগণ সাধারণ মানুষকে পবিত্র কুরআনের মধুময় তেলাওয়াত শুনিয়ে ধন্য করেন। রমযান মাস কুরআন অবতীর্ণের মাস। এই মাসের সঙ্গে কুরআন ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। একারণে পবিত্র রমযান এলে কুরআন তেলাওয়াতের সকলেই মনোনিবেশ করে থাকেন। সাধারণ তেলাওয়াতের পাশাপাশি ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহের নামায ও তাহাজ্জুদের নামাযে পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত রমযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিশেষভাবে তারাবীহের নামাযের মূল তাৎপর্য হলো, অধিক পরিমাণ কুরআন তেলাওয়াতে ধন্য হওয়া।

হাফেজ সাহেবগণ নিজে কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে কুরআন শুনিয়ে সওয়াব হাসিল করে থাকেন। বছরের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন ব্যস্ততা থাকার কারণে কম তেলাওয়াত হলেও, রমযানকে তারা কুরআন তেলাওয়াতের মোক্ষম সময় মনে করেন। যারা হাফেয নন, তারা এর মর্ম বুঝবেন না। কেননা, অধিকাংশ হাফেয রমযানের তেলাওয়াত ও তারাবীহে কুরআন খতমকে নিজের ইয়াদকে মজবুত রাখার অন্যতম মাধ্যম মনে করে থাকেন। অনেকের ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র মাধ্যম। কেননা, অন্য সময় স্বাভাবিক তেলাওয়াত করা হলেও ইয়াদ রাখার যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, সেটা শুধু রমযানেই সম্ভব হয়। কুরআনকে সংরক্ষণের গুরুত্ব বিবেচনা করলে খতমে তারাবীহের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

মাহে রমযান মু’মিনের জীবনের পরম আরাধ্য হলেও বর্তমান সময়ে তারাবীর ইমামগণকে হাদিয়া দেয়া বৈধ কি না, সে বিষয়ে বাক-বিতন্ডার ঝড় দেখা যায়, যা রমযানের মূল আবেদনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। হাফেয সাহেবগণ যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেমন কষ্ট করে থাকেন, তেমনি মুসল্লিগণ হাফেয সাহেবদেরকে অন্যান্য বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতোও গণ্য করেন না। একারণে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না, এবং এটি শরীয়তের মৌলিক হালাল-হারামের মতো কোন জটিল বিষয়ও নয়। এজন্য উভয় পক্ষকে নমনীয়তা অবলম্বন করে মৌলিক দলিলের প্রতি মনোনিবেশ করা উচিৎ।

তারাবীর ইমামগণকে সাধারণ মানুষ যে হাদিয়া প্রদান করে, সেটি স্বত:স্ফূর্তভাবেই দিয়ে থাকে। নির্ধারিত বেতনভুক্ত কোন কর্মচারীকে বেতন দেয়ার মতো কোন বিষয় এখানে থাকে না। এটি যে সাধারণ মুসল্লিদের স্বত:স্ফূর্ত ও একান্ত খুশির আতিশয্যে প্রদত্ত হাদিয়া তার প্রমাণ মুসল্লিগণ নিজেরাই। তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করলে বোঝা যাবে, তারা কি হাফেয সাহেবকে বিনিময় দিল না কি সন্তুষ্ট হয়ে হাদিয়া? এই হাদিয়ার উপর অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, সারা বছর আপনাকে হাদিয়া দিল না, এখন কেন দিল?

এর উত্তর তো স্বাভাবিক, মানুষ হাদিয়া দেয় অন্যের উপর সন্তুষ্ট হয়ে। আর সন্তুষ্টির বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হাফেয সাহেবগণ মুসল্লিদেরকে কুরআন শুনিয়ে সন্তুষ্ট করেছেন। একারণে তারা হাদিয়া দিয়েছে। এতে অপছন্দনীয় কিছু নেই। এমন অভিযোগ করলে সবধরণের হাদিয়া অবৈধ হবে। কেননা রাসূল স. কে সাহাবীগণ যে হাদিয়া দিতেন তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে দিতেন। নাউযুবিল্লাহ, এর দ্বারা কেউ এমনটি বলবে না যে, তিনি তার দাওয়াত ও নবুওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করেছেন। একইভাবে ছাত্র উস্তাদকে, মুরীদ পীর সাহেবকে হাদিয়া দিয়ে থাকেন। এসমস্ত ক্ষেত্রে হাদিয়া দানকারীর অন্তরে যেমন ঘুণাক্ষরে এ কথা আসে না যে, তিনি বিনিময় দিচ্ছেন, তেমনি হাদিয়া গ্রহণকারীও তার দ্বীনি কর্মের বিনিময় হিসেবে সেটা গ্রহণ করেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন,

وَهَلْ جَزَاءُ الإِحْسَانِ إِلاَّ الإِحْسَانُ

ইহসানের পুরস্কার ইহসান ব্যতীত কি হতে পারে?

এ আয়াতে যদিও পরকালের পুরষ্কারের কথা বলা হয়েছে, তবুও এ আয়াত দুনিয়ার অনুগ্রহের বিনিময়ে অনুগ্রহের প্রমাণ হতে পারে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। পূর্ববর্তী হানাফী  মাযহাবের উলামায়ে কেরামের বক্তব্য অনুযায়ী যে কোন ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ নয়। পরিভাষায় একে উজরত আলাত তায়াত বলে। কিন্তু পরবর্তী উলামায়ে কেরাম প্রয়োজনীয়তার প্রতি দৃষ্টি রেখে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে একে বৈধ বলে থাকেন । যেমন, কুরআন শিখান, ইমামতি ও মুয়াজ্জেনী ইত্যাদি।

উজরত আলা ত্বায়াত বা ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ বৈধ কি না, সে বিষয়ে ইমাম ইমাম আবু হানিফা র. এর সাথে অন্যান্য ইমামগণের যে মতানৈক্য রয়েছে, সে আলোচনা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছি। বরং হানাফী মাযহাবের মৌলিক কিতাবের আলোকে বর্তমান সময়ে খতম বা সূরা তারাবী শেষে ইমামগণকে যে হাদিয়া দেয়া হয়, তা দেয়া ও নেয়া বৈধ কি না, সে বিষয়ে দলীলসহ আলোচনা করা হয়েছে।

বর্তমান আমাদের দেশে হাফেজ সাহেবদেরকে যে পদ্ধতিতে টাকা দেয়া হয় তা, হানাফী মাযহাবের উলামায়ে মুতাকাদ্দিমীন  তথা পূববর্তী উলামাগণ এবং উলামায়ে মুতাআখখিরীন বা পরবর্তী উলামায়ে কেরামের বক্তব্য  অনুযায়ী বৈধ। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি দেয়া ও গ্রহণ করা সওয়াবের কাজ।

উলামায়ে মুতাকাাদ্দিমীনের বক্তব্য অনুযায়ী বৈধতার প্রমাণ:

হানাফী মাযহাবের উলামায়ে মুতাকাদ্দিমীন তথা পূর্ববর্তী আলেমগণের বক্তব্য অনুযায়ী, তারাবীহের ইমামদেরকে টাকা দেয়ার যে পদ্ধতি আামাদের দেশে প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ বৈধ। বরং একে তারা উত্তম সাব্যস্ত করেছেন।

আল-বাহরুর রায়েকের গ্রন্থকার লিখেছেন,

ثُمَّ يَدْخُلُ في كَوْنِهِ خِيَارًا أَنْ لَا يَأْخُذَ على الْأَذَانِ أَجْرًا فإنه لَا يَحِلُّ لِلْمُؤَذِّنِ وَلَا لِلْإِمَامِ لِحَدِيثِ أبي دَاوُد وَاتَّخِذْ مُؤَذِّنًا لَا يَأْخُذُ على الْأَذَانِ أَجْرًا قالوا فَإِنْ لم يُشَارِطْهُمْ على شَيْءٍ لَكِنْ عَرَفُوا حَاجَتَهُ فَجَمَعُوا له في وَقْتٍ شيئا كان حَسَنًا وَيَطِيبُ له وَعَلَى هذا المفتى لَا يَحِلُّ له أَخْذُ شَيْءٍ على ذلك لَكِنْ يَنْبَغِي لِلْقَوْمِ أَنْ يُهْدُوا إلَيْه كَذَا في فَتْحِ الْقَدِيرِ وهو على قَوْلِ الْمُتَقَدِّمِينَ

“অতঃপর উত্তম হওয়ার একটি শর্ত হলো আজানের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা। কেননা, মুয়াজ্জিন এবং ইমামের জন্য (পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু নেওয়া) বৈধ নয়; কারণ আবু দাউদ শরীফের হাদিসে এসেছে— '(রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:) তুমি এমন একজনকে মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করো, যে আজানের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করবে না।'

ফকীহগণ বলেন: যদি মুয়াজ্জিন তাদের সাথে কোনো পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করেন, কিন্তু লোকেরা তার অভাব বুঝতে পেরে কোনো এক সময়ে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে তাকে দেয়, তবে তা উত্তম এবং তার জন্য তা গ্রহণ করা হালাল।

অনুরূপভাবে মুফতির (ফতোয়া প্রদানকারীর) জন্য ফতোয়া দেওয়ার বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ করা বৈধ নয়। তবে জনগণের উচিত তাকে উপহার বা হাদিয়া প্রদান করা। 'ফাতহুল কাদির' গ্রন্থে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে এবং এটি পূর্ববর্তী ওলামাদের (মুতাকাদ্দিমীন) অভিমত।

[দেখুন, আল-বাহরুর রায়েক, খ.১, পৃ.২৬৮, শরহু ফাতহিল ক্বাদির, খ.১, পৃ.২৪৭]

বর্তমানে তারাবীহের ইমামগণ বিনিময়ের কোন শর্ত করেন না এবং তাকে নিয়োগ দেয়ার সময় কোন নির্দিষ্ট উজরত বা বিনিময় নির্ধারণ করা হয় না, একারণে তাকে যে টাকা দেয়া হয়, তা উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ বরং তা দেয়া ও নেয়া উত্তম। কেননা, উজরত আলাত তায়াত বা ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ অবৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে কুরআন শিখান, ইমামতি ও মুয়াজ্জেনী ইত্যাদি সবকিছু সমান ও হারাম। সুতরাং এসকল ক্ষেত্রে বিনিময়ের শর্ত ব্যতীত ইমাম যদি নিয়োগ দেয়া হয়, আর তার প্রয়োজনীয়তার কথা অনুধাবন করে মুসল্লিরা তাকে হাদিয়া দেয়, তবে তা উত্তম হবে। এটি হাদিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। কোন বিনমিয় বা পারিশ্রমিক নয়।

উলামায়ে মুতাআখখিরীনদের বক্তব্য অনুযায়ী তারাবীহের ইমামতির বিনিময় গ্রহণ বৈধ:

হানাফী মাযহাবের সকল ফতোয়ার কিতাবে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ইমামতি করে বিনিময় গ্রহণকে পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম হারাম বললেও পরবর্তী উলামায়ে কেরাম একে হালাল বলেছেন। আর ইমামতির মাঝে সকল নামাযের ইমামতি অন্তর্ভূক্ত, চাই তা পাঁচ ওয়ক্তের নামায, ঈদের নামায, তারাবীহের নামায কিংবা সালাতুল কুসুফ বা খুসুফের নামাযের ইমামতি হোক। শরীয়তে এই নামাযগুলোর ইমামতি বৈধ। সুতরাং এসকল নামাযের  ইমামতির বিনিময় গ্রহণ করাও বৈধ। দলিল ছাড়া তারাবীহের ইমামতিকে অন্যান্য ইমামতি থেকে পার্থক্য করা সমীচীন নয়। যারা এটা করেন, আমরা তাদেরকে বলব,

قُلْ هَاتُوأ بُرْهَانَكُم إنْ كُنْتُم صَادِقيْن

“যদি তোমরা তোমাদের বক্তব্যে সত্যবাদী হয়ে থাক তবে প্রমাণ উপস্থিত করো।”

যে কোন ধরণের ইমামতির বিনিময় গ্রহণের বৈধতার প্রমাণ:

১. আল্লামা ইবনে আবেদীন র. বলেছেন,

لان المتأخرين إنما أجازوا الاجر على أشياء خاصة نصوا عليها من الطاعات وهي: التعليم والاذان والامامة

“পরবর্তী উলামায়ে কেরাম সুনির্দিষ্ট কিছু ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণকে বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। সেগুলো হল, কুরআন শিখান, আযান ও ইমামতির বিনিময় গ্রহণ করা।”

২. আল্লামা ইবনে নুজাইম আল-বাহরুর রায়েকে লিখেছেন,

على الْمُخْتَارِ لِلْفَتْوَى في زَمَانِنَا فَيَجُوزُ أَخْذُ الْأَجْرِ لِلْإِمَامِ وَالْمُؤَذِّنِ وَالْمُعَلِّمِ والمفتى كما صَرَّحُوا بِهِ في كِتَابِ الْإِجَارَاتِ أَمَّا

“বর্তমান সময়ের গ্রহণযোগ্য ফতোয়া হল, ইমাম, মুয়াজ্জিন, শিক্ষক ও মুফতীর জন্য বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ”

৩. আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর এর গ্রন্থকার লিখেছেন,

لَا تَصِحُّ الْإِجَارَةُ عَلَيْهَا كَالْإِمَامَةِ وَالْأَذَانِ وَتَعْلِيمِ الْقُرْآنِ وَالْفِقْهِ وَلَكِنَّ الْمُعْتَمَدَ مَا أَفْتَى بِهِ الْمُتَأَخِّرُونَ مِنْ الْجَوَازِ

আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর, খ.১ পৃ.৪০

৪. আল্লামা ইবনে আবেদীন র. বলেছেন,

إن كان قصده وجه الله تعالى لكنه بمراعاته للاوقات والاشتغال به يقل اكتسابه عما يكفيه لنفسه وعياله، فيأخذ الاجرة لئلا ليمنعه الاكتساب عن إقامة هذه الوظيفة الشريفة، ولولا ذلك لم يأخذ أجرا فله الثواب المذكور، بل يكون جمع بين عبادتين: وهما الاذان، والسعي على العيال، وإنما الاعمال بالنيات.

মুয়াজ্জিনের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, কিন্তু সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং এ দায়িত্বে ব্যস্ত থাকার কারণে তার উপার্জন কমে যায় এবং সে তার পরিবার-পরিজনের জন্য প্রয়োজনমত উপার্জন করতে সক্ষম না হয়, একারণে সে বিনিময় গ্রহণ করে তবে তার জন্য বিনিময় গ্রহণ করা সওয়াবের কারণ হবে। বরং সে দু’টি ইবাদতকে একত্র করেছে। ১.আযান। ২. পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ। আর সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।

তারাবীহের ইমামতিকে অন্যান্য ইমামতি থেকে পৃথক করার কোন সুযোগ নেই। কেননা, ইমামতি করা হয় জামাত বদ্ধ হওয়ার জন্য। তারাবীহের নামায বিধিবদ্ধ হয়েছে জামাত বদ্ধ হয়ে আদায় করার জন্য।  আর জামাত বদ্ধ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য শিয়ারে  ইসলাম প্রকাশ করা। সুতরাং আযান যেমন সুন্নত (সু্ন্নতে মুয়াক্কাদাহ) হওয়া সত্ত্বেও শিয়ারে ইসলাম হওয়ার কারণে তার বিনিময় গ্রহণ বৈধ, তেমনি তারাবীহ একটি শেয়ারে ইসলাম হওয়ার কারণে তার ইমামতির বিনিময় বৈধ। তারাবীহ যে শিয়ারে ইসলাম তার অসংখ্য দলিল রয়েছে। অনেকে এটা বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, জরুরতের কারণে যেহেতু বিনিময় নেয়া বৈধ করা হয়েছে, আর তারাবীর ক্ষেত্রে যেহেতু জরুরত নেই, একারণে তা বৈধ নয়। আমি তাদেরকে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করতে চাই, এই জরুরতের অর্থ কী? হুকুমের দিক থেকে জরুরতের কথা বললে, আযান সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাবীহের হুকুমের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এটিও সুন্নতে মুয়াক্কাদা। অনেকে বলবেন, আযান তো শিয়ারে ইসলাম, একারণে আযানে বিনিময় গ্রহণ বৈধ। আমরা বলব, তারাবীহের নামায শিয়ারে ইসলাম। তারাবীহ যে শিয়ারে ইসলাম তার দলিল দেখুন-

فإن خير صلاة المرء في بيته هذا عام في جميع النوافل إلا في النوافل التي هي من شعائر الإسلام وهي العيد والكسوف والاستسقاء والتراويح

রাসূল স. হাদীসে বলেছেন, ফরজ নামায ব্যতীত মানুষের উত্তম নামায হলো, যেটা তার ঘরে আদায় করে। এটি সমস্ত নফলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে যেসমস্ত নফল শিয়ারে ইসলামের অন্তর্ভূক্ত সেগুলো ব্যতিক্রম যেমন, ঈদের নামায, কুসুফ ও ইস্তেসকার নামায এবং তারাবীহের নামায।

আল্লামা সিন্ধী র. লিখেছেন,

أن العلماء بعد ما صار قيام رمضان في المساجد من شعائر الإسلام يرون أنه في المسجد أفضل

তারাবীহের নামায শিয়ারে ইসলামের অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় উলামায়ে কেরাম তা মসজিদে আদায় করাকে উত্তম বলেছেন।

ইমাম নববী র. লিখেছেন,

قَوْله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( فَإِنَّ خَيْر صَلَاة الْمَرْء فِي بَيْته إِلَّا الصَّلَاة الْمَكْتُوبَة )

هَذَا عَامّ فِي جَمِيع النَّوَافِل الْمُرَتَّبَة مَعَ الْفَرَائِض وَالْمُطْلَقَة إِلَّا فِي النَّوَافِل الَّتِي هِيَ مِنْ شَعَائِر الْإِسْلَام ، وَهِيَ الْعِيد وَالْكُسُوف وَالِاسْتِسْقَاء وَكَذَا التَّرَاوِيح عَلَى الْأَصَحّ ، فَإِنَّهَا مَشْرُوعَة فِي جَمَاعَة فِي الْمَسْجِد

রাসূল স. বলেছেন, ফরজ নামায ব্যতীত পুরুষের উত্তম নামায হল ঐ নামায যে নামায ঘরে আদায় করা হয়।

এটি সমস্ত নফলের ক্ষেত্রে ব্যাপক, চাই তা নফলে রাতেবা হোক কিংবা মুতলাকা, তবে ঐ সমস্ত নফল ব্যতিক্রম যেগুলো শিয়ারে ইসলাম (ইসলামের প্রকাশ্য চিহ্ন) এর অন্তর্র্ভূক্ত যেমন, ঈদের নামায, কুসুফের নামায, ইস্তেসকার নামায এবং বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তারাবীহের নামায। কেননা এই নামায সমূহ জামাতের সঙ্গে মসজিদে আদায়ের জন্য বিধিবদ্ধ (মাশরু) হয়েছে।

সুতরাং যারা তারাবীহের ইমামতিকে অন্যান্য ইমামতি থেকে পৃথক করার চেষ্টা করেন, এট দলীল ছাড়া অপ্রয়োজনীয় একটি চেষ্টা। পক্ষান্তরে সকলক্ষেত্রে তারাবীহের ইমামতি অন্যান্য ইমামতির মতো তার অনেক দলিল রয়েছে।

ইমাম মুহাম্মাদ র. মাবসুতের মধ্যে লিখেছেন,

وإن استأجر المسلم من المسلم بيتا ليصلي فيه المكتوبة أو التراويح لم يجز ولا أجر له لما بينا

“কোন মুসলমান যদি অপর মুসলমানের নিকট ফরজ নামায কিংবা তারাবীহের নামায আদায়ের জন্য ভাড়া নেয়, তবে এই ভাড়া নেয়া বৈধ হবে না। এবং ঐ ব্যক্তি এর কোন বিনিময় পাবে না”

এখানে  ইমাম মুহাম্মাদ র. বাড়ী ভাড়া নেয়া না জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে ফরজ নামাযের সাথে তারাবীহকেও অন্তুর্ভূক্ত করেছেন। সুতরাং এর থেকে স্পষ্ট যে, অনেক হুকুমের দিক থেকে তারাবীহ ফরজ নামাযের মতোই। সুতরাং উভয়ের ইমামতি একই পর্যায়ের। অতএব, ফরজ নামাযের ইমামতির বিনিময় নেয়া বৈধ এবং তারাবীর ইমামতির বিনিময় নেয়া বৈধ নয়, এজাতীয় কথা বলার কোন অবকাশ নেই।

সারকথা, তারাবীহের ইমামগণকে যে টাকা দেয়া সেটা কোন বিনিময় নয়। কেননা, উজরত বা বিনিময় হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। ১. বিনিময় নির্দিষ্ট করা। ২.পরিমাণ নির্দিষ্ট করা। ৩. কাজের পূর্বে নির্দিষ্টকরণ সম্পন্ন করা।  এ বিষয়গুলো সাধারণ ইমামতি বা মুয়াজ্জেনীর ক্ষেত্রে পাওয়া গেলেও তারাবীহের ইমামতির ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। সাধারণ ইমামতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়োগ দেয়ার পূর্বে তার বেতন সুনির্দিষ্ট করা হয়, কিন্তু তারাবীহের ক্ষেত্রে এধরণে কোন বিষয় হয় না। সাধারণ ইমামতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত টাকার পরিমাণ থেকে কম-বেশির কারণে ইমাম অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন, কিন্তু তারাবীহের ক্ষেত্রে টাকার কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয় না, এবং এ নিয়ে কোন অভিযোগ উত্থাপন করা হয় না। সুতরাং তারাবীহের ইমামদেরকে যে টাকা দেয়া সেটা কোনভাবেই উজরত বলা যাবে না। সুতরাং যেটা উজরত বা বিনিময় নয়, সেটা উজরত বলে হারাম সাব্যস্ত করার কোন অর্থ নেই। কোন হাফেয যদি অন্যান্য ইমামদের মতো পূর্বে বেতন নির্ধারণ করে নেয়, তখন সেটা উজরত বা বিনিময় হিসেবে গণ্য হবে। এবং তখন সেটা বৈধ বা অবৈধ হওয়ার প্রশ্ন থাকবে। সুতরাং যে বিষয়টা উজরতের মধ্যেই পড়ে না, তাকে জোর করে উজরতের মধ্যে দাখেল করা, অপ্রয়োজনীয় তাকাল্লূুফ ছাড়া আর কিছুই নয়।

একটি সন্দেহের অপনোদন:

অনেকে বলে থাকেন, তারাবীহের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ কুরআন বিক্রির নামান্তর। সুতরাং খতম তারাবীহের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ বৈধ নয়।

উত্তর: আমি তাদেরকে বিনয়ের সঙ্গে বলব, দেখুন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি অপপ্রচার করা হয়েছে। কারণে অনেকে মনে করেন, মূল বিষয় হলো তারাবীহের নামাযে খতম করা, সুতরাং খতম তারাবীহ হলে টাকা নেয়া অবৈধ, আর সূরা তারাবীহ হলে টাকা নেয়া বৈধ। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং যারা অবৈধ বলেন, তারা সূরা তারাবী ও খতম তারাবী উভয়ের ইমামতির বিনিময় গ্রহণকে নাজায়েয বলেন। এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, ইমামতি। সে কোন সূরা পড়লো, বড় সূরা না কি ছোট সূরা, খতম করলো কি করল না, এগুলোর সাথে এই মাসআলার কোন সম্পর্ক নেই। কেননা, বিনিমিয় আসে নামাযের ইমামতির কারণে, ইমাম কোন সূরা পড়লো সে কারণে নয়। বিষয়টা এমন নয় যে, ইমাম বড় সূরা পরলে বেশি বেতন পাবেন এবং ছোট সূরা পড়লে কম বেতন পাবেন। তারাবীহের ইমামতির বিনিময়ে টাকা নেয়া বৈধ হলে, সূরা তারাবীহ এবং খতম তারাবীহ উভয়টাই বৈধ হবে। কারণ অল্প কুরআন বিক্রি করা যেমন হারাম, তেমনি বেশি কুরআন বিক্রিও হারাম। মোট কথা হল, ইমামতির বিনিময়ে টাকা নেয়ার অর্থ কুরআন বিক্রি করা নয়, কুরআন বিক্রির সাথে আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। যারা এটাকে কুরআন বিক্রি বলে মূল ইমামতির মাসআলাকে দৃষ্টির বাইরে রাখার চেষ্টা করেন, তাদের জন্য এ কাজটি করা কখনও সমীচীন নয়। 

আল্লামা ইবনে আবেদীন র. যে বলেছেন, দাতা ও গ্রহীতা উভয়ে গোনাহগার হবে, সেটা ইমামতির মাসআলা নয়, বরং এককভাবে কুরআনের বিনিময় গ্রহণ করা। যেমন, মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খানি করে তার বিনিময় নেয়া। যারা ফতোয়ায় শামী দেখে কুরআন খানি এবং ইমামতিকে একাকার করে ফেলেছেন, তাদেরকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে গবেষণার আবেদন করছি।

অন্যান্য ইমামতির সাথে হাফেজ সাহেবগণের ইমামতির পার্থক্য এতটুকু যে, হাফেজগণ সম্পূর্ণ কুরআন খতম করেন আর অন্যান্য নামাযে ইমামগণ কুরআন খতম করেন না। তারাবীহের নামাযে সম্পূর্ণ কুরআন খতম কোন অপরাধ নয় যে, এটার কারণে তিনি ইমামতির বিনিময় গ্রহণ করতে পারবেন না। কেননা তারাবীহ শরিয়তে বিধি-বদ্ধ (মাশরু) হয়েছে কুরআন খতমের জন্য। তারাবীহের তাকাযা হল, কুরআন খতম।

তাবইনুল হাকাইক এর গ্রন্থকার লিখেছেন,

وَلَا يَتْرُكُ الْخَتْمَ مَرَّةً لِكَسَلِ الْقَوْمِ بِخِلَافِ الدَّعَوَاتِ في التَّشَهُّدِ حَيْثُ يَتْرُكُ إذَا عَرَفَ منهم الْمَلَلَ وَاخْتَلَفُوا فِيمَنْ يَخْتِمُ قبل تَمَامِ الشَّهْرِ فَقِيلَ يُصَلِّي الْعِشَاءَ في بَقِيَّةِ الشَّهْرِ من غَيْرِ تَرَاوِيحَ وَلَا يُكْرَهُ له ذلك لِأَنَّهَا شُرِعَتْ لِأَجْلِ خَتْمِ الْقُرْآنِ وقد حَصَلَ مَرَّةً وَقِيلَ يُصَلِّي التَّرَاوِيحَ

মানুষের অলসতার কারণে একবার খতমকে পরিত্যাগ করবে না। তাশাহহুদের পরবর্তী দোয়াগুলো এর বিপরীত। যদি মানুষের বিরক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তা পরিত্যাগ করতে পারবে। উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন, কেউ যদি মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বে খতম করে, তার হুকুম কি?  কেউ বলেছেন, সে অবশিষ্ট দিনগুলো শুধু ইশার নামায আদায় করবে। এবং এটি মাকরুহ হবে না। কেননা তারাবীহ মাশরু (বিধি-বদ্ধ) হয়েছে কুরআন খতমের উদ্দেশ্যে। আর এটি একবার আদায় করার দ্বারা উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, সে তারাবী আদায় করতে থাকবে।

ফতোয়ায় আলমগীরিতে তিন বার খতমকে উত্তম বলা হয়েছে।

উলামায়ে কেরাম তারাবীহের নামাযে কুরআন খতমকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন যে, সাধারণ ইমাম যদি খতম তারাবীহ পড়াতে আগ্রহী না হয়, তবে তার পরিবর্তে অন্য ইমাম নিয়োগ দিবে, যে খতম করবে।

আল্লামা ইবনে নুজাইম আল-বাহরুর রায়েকে লিখেছেন,

وفي فَتْحِ الْقَدِيرِ وَغَيْرِهِ وإذا كان إمَامُ مَسْجِدِ حَيِّهِ لَا يَخْتِمُ فَلَهُ أَنْ يَتْرُكَ إلَى غَيْرِهِ

“ফাতহুল ক্বাদীর ও অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে, এলাকার ইমাম যদি খতম না করেন, তবে সে যেন অন্যকে ইমামতির দায়িত্ব দেয়।”

সুতরাং তারাবীহের মৌলিক উদ্দেশ্য হল, কুরআন খতম করা। যারা খতমে তারাবীহ থেকে বিমুখ করে মানুষকে সূরা তারাবীহের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, তারা মূলত: তারাবীহের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। খতম যেহেতু তারাবীহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এখানে তারাবীহের নামাযে  কুরআন খতমকে কুরআন বিক্রির সাথে তুলনা করা সঙ্গত নয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ: আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কায় প্রাসঙ্গিক অনেক দলীল উল্লেখ থেকে বিরত থাকা হয়েছে। উক্ত আলোচনার পর যদি কারও কোন প্রশ্ন থাকে তবে সরাসরি আমাদের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইল। প্রয়োজনীয় বিষয়ে দলীল সহ আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

------ ------

মন্তব্য 1

আপনার মন্তব্য জানান
রবিউল ইসলাম কাজী 15 hours,24 minutes আগে

১. তারাবিহ শিয়ারে ইসলাম হওয়ার ব্যাপারে যে কথাগুলো লিখেছেন রেফারেন্স উল্লেখ করলে ভালো হতো ?
২. এই বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে একটা রিসালা বার করেছে আপনি কি ওটা পড়েছেন ?

পড়ে থাকলে জানাবেন আরো কিছু কথা আপনার সাথে ডিসকাস করব , ইন শা আল্লাহ

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 5
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 10
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 12
আক্বিদা

নবীজীর শানে বিবাহ পূর্ব প্রেমের কাহিনীর মাধ্যমে জঘন্য পর্যায়ের গোস্তাখী

ইজহারুল ইসলাম · 13 জুন, 2023 · 6