আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম শুক্র, 30 জুন, 2023
74

ইবনে উমর রা: এর উপর ইবনে তাইমিয়ার শিরকের অপবাদ

 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: ছিলেন শীর্ষস্থানীয় ফকীহ সাহাবী। সাহাবীগণের মধ্যে ফিকহ, ফতোয়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে চারজন সাহাবী ছিলেন আব্দুল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ। তাদের অন্যতম ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা:। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: বিভিন্ন ক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস থেকে বরকত হাসিলের চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে, নবীজী যেসব জায়গায় নামাজ আদায় করেছেন, সেসব জায়গা খুঁজে খুঁজে তিনি নামাজ আদায় করতেন। 

এ বিষয়ে মুয়াত্তায়ে মালিকে ইমাম মালিক রহ: বর্ণনা এনেছেন,

عن عبد الله بن عبد الله بن جابر بن عتيك، أنه قال: جاءنا عبد الله بن عمر في بني معاوية -وهي قرية من قرى الأنصار- فقال: هل تدرون أين صلى رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدكم هذا؟، فقلت له: نعم؛ وأشرت إلى ناحية منه، فقال لي: هل تدري ما الثلاث التي دعا بهن فيه؟، فقلت له: نعم، قال: فأخبرني بهن، قال: فقلت: دعا بأن لا يظهر عليهم عدوا من غيرهم، ولا يهلكهم بالسنين فأعطيهما، ودعا بأن لا يجعل بأسهم بينهم فمنعها، قال: صدقت. قال ابن عمر: فلن يزال الهرج إلى يوم القيامة

অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাবের বিন আতিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনু মুয়ায়িয়া গোত্রে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: আমাদের কাছে একবার আসলেন। এই গোত্রটি মূলত: আনসার সাহাবীদের একটি গ্রাম ছিলো। ইবনে উমর রা: এসে বললেন, তোমরা কি জানো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের এই মসজিদের কোথায় নামাজ আদায় করেছেন? আমি তাকে বললাম, হ্যাঁ। এরপর মসজিদের একটি কোনার দিকে ইঙ্গিত করলাম। 

[মুওয়াত্তায়ে মালিক, হা: ৫৭৫]


সহীহ বোখারীতেও এ সংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে। 

 

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্দিল বার (মৃত: ৪৬৩ হি:)  রহ: বলেন,

فيه ما كان عليه ابن عمر من التبرك بحركات رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم اقتداء به وتأسيا بحركاته؛ ألا ترى أنه إنما سألهم عن الموضع الذي صلى فيه رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدهم ليصلي فيه تبركا بذلك ورجاء الخير فيه

অর্থাৎ উপর্যুক্ত হাদীস থেকে এটিও প্রমাণিত হয় যে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: নবীজীর বিভিন্ন কাজ ও আমল থেকে বরকত হাসিল করতে চাইতেন। বিশেষ করে অধিক অনুসরণ - অনুকরণ, স্মরণ ইত্যাদির মাধ্যমে। তুমি কি দেখো না যে, তিনি উপরের হাদীসে নবীজী তাদের মসজিদের কোথায় নামাজ পড়েছেন, সেখানে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বরকত ও কল্যাণের আশা করে  এটি জিজ্ঞেস করেছেন?

 

[আত-তামহীদ, খ: ১৯, পৃ: ১৯৭ ]
 

 

মালেকী মাজহাবের আরেক ইমাম ইবনুল আরাবী আল-মালেকী (মৃত: ৫৪৩ হি:)  রহ: বলেন,

 

في هذا الحديث أن رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم كان يأتي قرى الأنصار ويصلي في مساجدها ودورها، ليتبرك بالصلاة فيها بعده

 

অর্থাৎ এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার সাহাবীদের মসজিদ ও ঘরে এসে নামাজ আদায় করতেন যেন পরবর্তীতে তারা এটিকে বরকত হাসিলের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।[আল-মাসালিক ফি শরহি মুয়াত্তায়ে মালিক, খ:৩, পৃ:৪৭৯ ]

 


 

ইমাম জুরকানী (মৃত: ১১২২ হি:) উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,

 

هل تدرون أين صلى رسول الله، صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدكم هذا؟”: لأصلي فيه وأتبرك به لأنه كان حريصا على اقتفاء آثاره

অর্থাৎ ইবনে উমর রা: তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, তোমরা কি জানো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের এই মজসিদের কোথায় নামাজ আদায় করেছেন? (এর দ্বারা তিনি মূলত: বলতে চেয়েছেন)  কারণ, আমি সেখানে নামাজ আদায় করতে চাই এবং এর মাধ্যমে বরকত হাসিল করতে চাই। কেননা, ইবনে উমর রা: নবীজীর রেখে যাওয়া বস্তু ও আমল থেকে বরকত হাসিলের ব্যাপারে উন্মুখ ছিলেন। 

 


 

ইবনে উমর রাজি: এর উপরের আমলকে ইবনে তাইমিয়া তার কিতাবে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। সেই সাথে মারাত্মক কিছু অপবাদ ও অভিযোগ জুড়ে দিয়েছেন এর উপর। ইবনে তাইমিয়া তার ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম কিতাবের ২ খন্ডে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন,

 

“নবীজী সাল্লাল্লাহু ঘটনাক্রমে যেসব জায়গায় নামাজ আদায় করেছেন, সেখানে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্য করাটা ইবনে উমর ছাড়া অন্য কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি। বরং হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী, সমস্ত আনসার ও মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে হজ্ব, উমরা বা সফরের জন্য মদিনায় যেতেন, তাদের কারও থেকে এটি বর্ণিত হয়নি যে, তারা নবীজীর নামাজের জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে নামজ আদায় করেছেন। আর এটা জানা কথা যে, এটি তাদের কাছে যদি মুস্তাহাব হতো, তাহলে তারা এবিষয়ে অগ্রগামী থাকতেন। কারণ, তারা নবীজীর সুন্নত সম্পর্কে বেশি জানতেন এবং অন্যদের চেয়ে তা অনুসরণে অগ্রগামী ছিলেন। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের উপর আমার সুন্নত ও আমার পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত অনুসরণ করা কর্তব্য। তোমরা এগুলো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে রাখো। সাবধান, নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক নব-সৃষ্ট বিষয়ই বিদয়াত। আর প্রত্যেক বিদয়াতই ভ্রষ্টতা। 

 

সুতরাং এভাবে নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে খুঁজে সেখানে নামাজ আদায় করা খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত নয়।  বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদয়াত। আর সাহাবীর বক্তব্য যখন অন্যদের বিপরীত হয়, তখন সেটি দলিল থাকে না। তাহলে সমস্ত সাহাবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই আমল কীভাবে দলিল হতে পারে? 

 

তাছাড়া এভাবে নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে খুঁজে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে এটিকে মজসিদ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। অথচ শরীয়াতে এজাতীয় বিষয়ে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এটি আল্লাহর সাথে শিরকের মাধ্যমও।……” 

 

 

ইবনে তাইমিয়ার উপরের বক্তব্য থেকে যেসব বিষয় সামনে আসছে,

 

১। ইবনে উমর রা: সেসব জায়গা খুঁজে খুঁজে নামাজ আদায় করতেন যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন। 

২। ইবনে উমর রা: ছাড়া অন্য কারও থেকে এসব জায়গায় নামাজ আদায়ের কথা বর্ণিত হয়নি। 

৩। ইবনে উমর রা: এর এই আমলটি ভ্রষ্টতাপূর্ণ বিদয়াত। আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, বরং এটি শিরকের মাধ্যম। 

 

ইবনে তাইমিয়ার উপরের বক্তব্যের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্ট। সেটি হলো, ইবনে তাইমিয়া যে মতটি গ্রহণ করেছে সেটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত এমনকি খোলাফায়ে - রাশেদীন, প্রথম সারির আনসার - মুহাজিরীন সকলের মত হিসেবে উপস্থাপন করা। এর বিপরীত মত অর্থাৎ হযরত ইবনে উমর রা: এর মতকে বিচ্ছিন্ন মত, অন্য সাহাবীদের বিপরীতে একক মত, বিদয়াত, শিরকের মাধ্যম ইত্যাদি আখ্যা দেয়া। এটি আসলে ইবনে তাইমিযার খুবই পুরাতন সমস্যা। এই সমস্যা বহু উলামায়ে কেরাম হাতে-নাতে দেখিয়েছেন। নিজের মতের পক্ষে তিনি সর্ব-সম্মত মত, ঐকমত্য, ইজমা ইত্যাদির মিথ্যা দাবী করে সাধারণ মানুষের সাথে ধোঁকাবাজী ও প্রতারণা করে থাকেন। যদিও বিষয়গুলো খুব স্পষ্ট বিষয় হোক। কিন্তু খুব সাধারণ ও স্পষ্ট বিষয়েও নিজের মতের পক্ষে ইবনে তাইমিয়া ইজমা বা সর্ব-সম্মত মতের দাবী করে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে থাকেন। এটি বলা যায়, তার একটি অভ্যাসগত বিষয়। তিনি যতো বিষয়ে এভাবে ইজমার দাবী করেছেন ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এর অধিকাংশই মিথ্যা। আল-ইয়াজু বিল্লাহ। 

 

নিজের মতের পক্ষে ইজমা বা ঐকমত্যের দাবী করে ইবনে তাইমিয়ার  এধরণের মিথ্যাচার ও প্রতারণা বহু উলামায়ে কেরামের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বিষয়। উদাহরণ হিসেবে আমি এখানে ইমাম ত্বকিউদ্দীন হুসোনী (752-829 হি:) রহ: এর কিছু আলোচনা উল্লেখ করছি। ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: তার দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার এধরণের অনেকগুলো মিথ্যাচার ও প্রতারণার উদাহরণ এনে উম্মতকে তার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এ কিতাবের ৯৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন,

 

“ইবনে তাইমিয়ার একটি পাপকাজ হলো, সে যা বলে এবং যার পক্ষে ফতোয়া দেয়, এর উপর ইজমার দাবী করে থাকে। যেমন মক্কা উত্তম নাকি মদীনা এই বিষয়ে সে তার নিজের মতের পক্ষে ইজমার দাবী করেছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে ওলামাদের মতবিরোধ খুবই প্রসিদ্ধ। এমনকি মানুষের কাছে সহজলভ্য কিতাব কাজী ইয়াদের শিফাতেও এই মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ইমাম মালিক রহ: ও অধিকাংশ মদিনাবাসীর মত হলো, মদিনা মক্কা থেকে উত্তম। মক্কাবাসী ও কুফাবাসীর মত হলো, মক্কা উত্তম।”

 

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ৯৪]







 



 

একই কিতাবের ১৪৭ পৃষ্ঠায় ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: লিখেছেন, 

 

“উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, ইবনে তাইমিয়া ইজমার দাবী করার ক্ষেত্রে মিথ্যাচার করে থাকে। যে তার এজাতীয় দাবীর অনুসন্ধান করবে সে তার এই মিথ্যাচার দেখতে পাবে। অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু সে অন্যের থেকে বর্ণনা করে যা নিরেট মিথ্যা। অন্যের কথা নকল করলেও সঠিকভাবে করে না। আর সঠিকভাবে বর্ণনা করলেও এমন কথা ঢুকিয়ে দেয় যা ঐ ব্যক্তির বক্তব্য নয়। বিষয়টি ভালোভাবে জেনে রেখো এবং তার তাকলীদ করার বিষয়ে সতর্ক থেকো। কারণ, এরকম তাকলীদ করলে সে যেমন ধ্বংস হয়েছে, তুমিও হবে।”

 

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ১৪৭ ]







 


 

একই কিতাবের ১৫১ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন,

“ ঐকমত্য ও ইজমার দাবীর ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার চেয়ে বড় মিথ্যুক ও এধরণের পাপকাজে অধিক দু:সাহসী আর কাউকে দেখিনি” 

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ১৫১ ]


 


 

একই ধরণের কথা তিনি ১৫৫ ও ১৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। 

এখানে ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: এর বক্তব্য বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে এর চেয়ে ভয়াবহ। আসলে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যার বেসাতির কোন কুল-কিনারা নেই। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারীর ‘আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন’ দেখা যেতে পারে। যেখানে তিনি জায়গায় জায়গা ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যাচার ও প্রতারণা স্পষ্ট করেছেন। ইজ্জুদ্দিন বিন আব্দুস সালামের একটি বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলে এ কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি এর প্রতিবাদ করে লিখেছেন, 

“আমার মত হলো, ইবনে তাইমিয়ার এই ভুলটি অনিচ্ছাকৃত নয়। বরং এটি তার ইচ্ছাকৃত বিকৃতি”

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ৫৩]

 

এখানে ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: এর বক্তব্য বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে এর চেয়ে ভয়াবহ। আসলে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যার বেসাতির কোন কুল-কিনারা নেই। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারীর ‘আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন’ দেখা যেতে পারে। যেখানে তিনি জায়গায় জায়গা ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যাচার ও প্রতারণা স্পষ্ট করেছেন। ইজ্জুদ্দিন বিন আব্দুস সালামের একটি বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলে এ কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি এর প্রতিবাদ করে লিখেছেন, 

“আমার মত হলো, ইবনে তাইমিয়ার এই ভুলটি অনিচ্ছাকৃত নয়। বরং এটি তার ইচ্ছাকৃত বিকৃতি”

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ৫৩]










 



 

একই কিতাবের ২১৯ পৃষ্ঠায় আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারী রহ: বলেন,

 

“পূর্বের আলোচনায় ইজ্জুদ্দিন ইবনে আব্দিস সালামের বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া যে ভুল করেছেন সেটি উল্লেখ করেছি। এটি সম্ভবত: তার ইচ্ছাকৃত ভুল। আমার কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, উলামাদের বক্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়া বিশ্বস্ত বা নিরাপদ নন”। 

 

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ২১৯ ]













 


 

ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে একই কথা বলেছেন, বিখ্যাত ইমাম ত্বকিউদ্দীন সুবকী রহ:। তিনি তার ফতোয়ায় লিখেছেন,

 

وَهَذَا الرَّجُلُ [=ابن تيميّة] كُنْت رَدَدْتُ عَلَيْهِ فِي حَيَاتِهِ فِي إنْكَارِهِ السَّفَرَ لِزِيَارَةِ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ [وَآلِهِ] وَسَلَّمَ، وَفِي إنْكَارِهِ وُقُوعَ الطَّلَاقِ إذَا حُلِفَ بِهِ، ثُمَّ ظَهَرَ لِي مِنْ حَالِهِ مَا يَقْتَضِي أَنَّهُ لَيْسَ مِمَّنْ يُعْتَمَدُ عَلَيْهِ فِي نَقْلٍ يَنْفَرِدُ بِهِ لِمُسَارَعَتِهِ إلَى النَّقْلِ لِفَهْمِهِ...وَلَا فِي بَحْثٍ يُنْشِئُهُ لِخَلْطِهِ الْمَقْصُودَ بِغَيْرِهِ وَخُرُوجِهِ عَنْ الْحَدِّ جِدًّا

অর্থাৎ এই ব্যক্তিকে (ইবনে তাইমিয়া) তার জীবদ্দশায় নবীজীর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা হারাম বিষয়ক বক্তব্য ও তালাকের ব্যাপারে কসম খেলে সেটি সংগঠিত হওয়ার বিষয়ে তার খন্ডন করেছি। এরপর তার বিষয়ে আমার কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সে কোন বিষয় এককভাবে বর্ণনা করলে এর উপর নির্ভর করা যায় না। কারণ, অনেক কিছু সে নিজের বুঝ অনুযায়ী বর্ণনা করে। এছাড়া তার নিজের শুরু করা কোন মাসআলার উপরও নির্ভর করা যায় না। কারণ সে আলোচনার বিষয়বস্তু পাল্টে ফেলে এবং মূল বিষয়ের সীমা থেকে বহু দূরে চলে যায়। 

[ফতোয়াস সুবকী, খ: ২, পৃ: ২১০]



 

 





 

শায়খ সালামাহ কুদায়ী ইজামী রহ: বিখ্যাত আলিম ছিলেন। আল্লামা জাহেদ কাউসারী রহ: তার বিভিন্ন কিতাবের উপর প্রশংসাবাণী দিয়েছেন। তিনিও তার কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় নানা মিথ্যাচারের স্বরুপ স্পষ্ট করেছেন। তিনি তার ‘বারাহিনুল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ কিতাবে লিখেছেন, 

“এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নানা রকম চিন্তাগত বিচ্যূতি আছে যেগুলোতে তারা সমস্ত উম্মতের বিরোধিতা করে এবং সবাইকে পরিত্যাগ করে থাকে। মানুষকে তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যূত করতে এরা ধোঁকাবাজী ও প্রতারণায় উস্তায। সত্য ও সঠিক বিষয় জানার আগে কেউ যদি তাদের কিতাব পড়ার বিপদে নিপতিত হয়, সে তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত মূর্খতা ( জাহেলে মুরাক্কাব) শিখবে। কোন কোন আলিম তো বলেছেন, সাজান - গোছান মূর্খতা শিখবে। (অর্থাৎ মূর্খতাকে তারা সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে থাকে)। কারণ তাদের কারণে সে বাতিল জিনিসকে হক্ব মনে করা শুরু করবে। আর তাদের বিপরীত যারা আছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামা হলেও তাদেরকে বাতিল মনে করা শুরু করবে। সে বিশ্বাস করা শুরু করবে, প্রকৃত সুন্নতের উপর এবং কুরআন-সুন্নাহের একমাত্র সঠিক বুঝের উপর কেবল তাদের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই রয়েছে। অথচ বিষয়টি এমন হওয়া আল্লাহর চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওয়াদা করেছেন যে, তার উম্মত সকলে ভ্রষ্টতার উপর একমত হবে না। আর আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিশ্রুতিতে সদা সত্য। তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন, প্রত্যেক যুগে নবীজী ও তার প্রকৃত অনুসারী উলামাদেরকে সাহায্য করেছেন। নবীজী ও তার অনুসারী উলামাদের উপর শতকোটি দুরুদ ও সালাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “দ্বীনের এই ইলমকে প্রত্যেক পরবর্তী যুগের ন্যায়-পরায়ণ ব্যক্তিরা বহন করবে। সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল মতাদর্শীদের চিন্তা-চেতনা, অজ্ঞ-মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে তারা দ্বীনকে সংরক্ষণ করবে।”

 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আমি আপনার কাছে এই উপদেশমালা (দ্বীন ও কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, আমিই এর সংরক্ষণ করব।” আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এই দ্বীনের সংরক্ষণ হবে এর নীতিমালা ও বিধি-বিধান এতো অধিক সংখ্যক উলামাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হবে যে, যখনই কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী বের হবে বা উলামাদের জামায়াত থেকে কেউ বের হয়ে যাবে, কুরআন-সুন্নাহের ইলমে অভিজ্ঞ উলামা ও ফকীহদের কাছে তার এই বিচ্ছিন্নতা ও দলছুট হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী যতই নিজের এই বিচ্ছিন্ন চিন্তা-চেতনাকে সুন্নতের অনুসরণ ও কুরআন - হাদীস সংরক্ষণ ইত্যকার বড় বড় দাবীর মাধ্যমে ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক। সে নিজেকে কিংবা তার ব্যাপারে অজ্ঞ কেউ তাকে যতই বড় বড় উপাধি দিক যেমন, নিজেকে সালাফী দাবী করা কিংবা সালাফের অনুসারী ইত্যাদি দাবী করা। এজন্য মুজতাহিদ উলামাদের ইজমা শরীয়াতের খুবই শক্তিশালী একটি দলিল। তাদের ইজমা থেকে বের হয়ে যাওয়া ভ্রষ্টতা ও বিদয়াতের নিদর্শন। এজন্য তুমি দেখবে, এই নতুন নতুন বিদয়াত তৈরিতে দক্ষ এই বিদয়াতী (ইবনে তাইমিয়া), তার নিজের তৈরি বিদয়াতের বিরুদ্ধে উম্মতের ইজমাকে খুব জোর গলায় অস্বীকার করতে চায়। বরং মিথ্যা ও জালিয়াতির মাধ্যমে  তার নিজের মতের পক্ষে ইজমা বা ঐকমত্যের দাবী করে। যেমনটি তুমি তিন তালাক ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের উপরের আলোচনা থেকে ইবনুল কাইয়্যিম ও তার উস্তাযের কাজ থেকে দেখেছো।”








 












 


 





 

শায়খ নিদাল বিন ইব্রাহীম আলু রাশশী ইবনে তাইমিয়ার এই মিথ্যাচার ও প্রতারণার উপর লম্বা আলোচনা করেছেন তার রফউল গাশিয়াহ কিতাবে। আলোচনার শুরুতে তিনি বলেন,

 

“ আমি আগে যেমনটি বলেছি, ইবনে তাইমিয়া ইজমা ইত্যাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যাচার করে থাকে। যেই কথার কোন শরয়ী ভিত্তি নেই এমন কথাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নত, অধিকাংশ সালাফ, অধিকাংশ মুহাদ্দিসীনদের নামে চালিয়ে দেয়। এটা শুধু আকিদার ক্ষেত্রে করে এমন নয়, বরং শাখাগত মাসআলা-মাসাইল ও ইমামদের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই কাজ করে থাকে। একটি শাখাগত বিষয়ের উদাহরণ দেয়াই এখানে যথেষ্ট যার দ্বারা স্পষ্ট হবে যে, ইবনে তাইমিয়া কী পরিমাণ ভ্রষ্টতা, প্রবৃত্তিপূজা, নিজের মতকে বড় করে দেখান, নিজের আকিদার সমর্থনে মিথ্যা বলে হলেও সেটিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ের ছিলো।”

 

 

 


 

নিজের মতের পক্ষে ইজমার দাবী, সর্ব-সম্মত মত ইত্যাদি বলার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার চিরাচরিত মিথ্যাচার নিয়ে অন্য কোথাও বিস্তারিত লিখব ইনশা আল্লাহ। উপরের আলোচনা থেকে এতটুকু স্পষ্ট করা উদ্দেশ্য যে, ইবনে উমর রা: এর উপর ইবনে তাইমিয়া সেই একই রকমের মিথ্যাচার করে তার অবস্থানকে অন্যান্য সাহাবীদের বিরোধী একক মত, বিদয়াত ও শিরকের মাধ্যম বানাতে চেয়েছে। এটি মূলত: ইবনে তাইমিয়ার পুরাতন টেকনিক। অধিকাংশ বিষয়ে তিনি এই ধরণের মিথ্যাচার করে থাকেন। এবার চলুন, ইবনে তাইমিয়ার এই ধোঁকাবাজীর স্বরুপ বিশ্লেষণ করা যাক আরেকটু বিস্তারিতভাবে। 

 

নবীজীর সাথে সম্পর্কিত বস্তু বা আমলের মাধ্যমে বরকত হাসিলের প্রচেষ্টা যেমন যেখানে যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন সেখানে নামাজ আদায়ের চেষ্টাকে ইবনে তাইমিয়া উপরে বিদয়াত, আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য, শিরকের মাধ্যম ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছেন। অথচ পবিত্র কুরআনে সু্স্পষ্টভাবে মাকামে ইব্রাহীমে নামাজ আদায়ের আদেশ করা হয়েছে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, মাকামে ইব্রাহীম কী জিনিস? এর সহজ উত্তর হলো, যেই পাথরে দাঁড়িয়ে হযরত ইব্রাহীম আ: পবিত্র কা’বা নির্মাণ করেছিলেন সেটিই মাকামে ইব্রাহীম। ইব্রাহীম আ: এর এই স্মৃতির পাশে যদি নামাজ পড়ার বিধান সুস্পষ্টভাবে কুরআনে আসে এবং সেটি যদি শিরকের মাধ্যম না হয়, তাহলে নবীজীর নামাজের জায়গায় ইবনে উমর রা: এর আমল শিরকের মাধ্যম হবে কেন? যদি নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা থেকে বরকত হাসিল করা কিংবা সেটিকে উপলক্ষ্য বানিয়ে শরীয়াতের বৈধ আমলকে শিরকের মাধ্যম বলা হয়, তাহলে মাকামে ইব্রাহীমে নামাজ আদায় করা শিরকের মাধ্যম নয় কেন? ইবনে তাইমিয়ার কাছে কোন কিছুকে শিরক বা শিরকের মাধ্যম বলার মূলনীতিটা আসলে কী? নাকি ইয়াহুদী মুসা ইবনে মাইমুনের কাছ থেকে শিরক-তাওহীদের সবক নিয়ে সাহাবীদের আমলেও শিরক দেখা শুরু করেছিলেন? 

 

মজার ব্যাপার হলো, উপরে ইবনে উমর রা: এর আমলকে অন্য সাহাবীদের আমলের বিরোধী ও বিচ্ছিন্ন আমল সাব্যস্ত করার জন্য এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে যেন খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে সবাই এই আমলেের বিরোধী ছিলেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসুন বোখারী থেকে বিষয়টি বোঝা যাক। 

 

ইমাম বোখারী রহ: হযরত উমর রা: থেকে হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি বিষয় হযরত উমর রা: এর ইচ্ছার অনুরুপ অবতীর্ণ করেছেন। এ বিষয়ে নিচের হাদীসটি লক্ষণীয়,

 

حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عَوْنٍ، قَالَ حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ عُمَرُ وَافَقْتُ رَبِّي فِي ثَلاَثٍ، فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى فَنَزَلَتْ ‏(‏وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏)‏ وَآيَةُ الْحِجَابِ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَوْ أَمَرْتَ نِسَاءَكَ أَنْ يَحْتَجِبْنَ، فَإِنَّهُ يُكَلِّمُهُنَّ الْبَرُّ وَالْفَاجِرُ‏.‏ فَنَزَلَتْ آيَةُ الْحِجَابِ، وَاجْتَمَعَ نِسَاءُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم فِي الْغَيْرَةِ عَلَيْهِ فَقُلْتُ لَهُنَّ عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبَدِّلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ‏.‏ فَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ‏.‏

 

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাযি.) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর ওয়াহীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ ‘‘তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান বানাও’’- (সূরাহ্ আল-বাক্বারাহ ২/১২৫)। (দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আপনার সহধর্মিণীগণকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাঁদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়। আর একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে একত্রে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাঁদেরকে বললামঃ ‘‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের ত্বলাক (তালাক) দেন, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম অনুগত স্ত্রী দান করবেন’’- (সূরাহ্ তাহরীম ৬৬/৫)। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

 

বোখারী, হা: ৩০২

 

 

 

 

উপরের হাদীসে হযরত উমর রা: খুব স্পষ্টভাবে নবীজীর কাছে মাকামে ইব্রাহীমকে নামাজের জায়গা বানাবার জন্য আবেদন করেছেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়। নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত জিনিসকে কেন্দ্র করে নামাজ ইত্যাদির আমল যদি শিরকের মাধ্যম হতো, তাহলে উমর রা: এই ইচ্ছা ব্যক্ত করতেন না আর এ বিষয়ে কুরআনের আয়াতও নাজিল হতো না। 

 

দ্বিতীয়ত: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইবনে কাসীর বাইতুল মুকাদ্দাসের বিজয়ের ঘটনা বিস্তারিত লিখেছেন। সেখানে তিনি হযরত উমর রা: এর আমল তুলে ধরেছেন, 

 

قال الإمام أحمد: حدثنا أسود بن عامر، ثنا حماد بن سلمة عن أبي سنان، عن عبيد بن آدم، وأبي مريم، وأبي شعيب: أن عمر بن الخطاب كان بالجابية فذكر فتح بيت المقدس، قال: قال ابن سلمة: فحدثني أبو سنان، عن عبيد بن آدم سمعت عمر يقول لكعب: أين ترى أن أصلي؟

قال: إن أخذت عني صليت خلف الصخرة، وكانت القدس كلها بين يديك.

فقال عمر: ضاهيت اليهودية، لا ولكن أصلي حيث صلى رسول الله ﷺ، فتقدم إلى القبلة فصلى، ثم جاء فبسط ردائه وكنس الكناسة في ردائه، وكنس الناس.

وهذا إسناد جيد، اختاره الحافظ ضياء الدين المقدسي في كتابه (المستخرج)، وقد تكلمنا على رجاله في كتابنا الذي أفردناه في مسند عمر، ما رواه من الأحاديث المرفوعة، وما روى عنه من الآثار الموقوفة مبوبا على أبواب الفقه، ولله الحمد والمنة.

 

অর্থাৎ ইমাম আহমাদ রহ: বলেন, আমাদের কাছে আসওয়াদ বিন আমের বর্ণনা করেছেন, আমাদের কাছে হাম্মাদ বিন সালামা আবু সিনান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি উবাইদ বিন আদম, আবু মারইয়াম ও আবু শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমর রা: জাবিয়া নামক স্থানে ছিলেন। তখন তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের ঘটনা আলোচনা করলেন। তিনি বলেন, ইবনে সালামা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আবু সিনান উবাইদ বিন আদম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি উমর রা: কে কা’য়াব আল-আহবারকে বলতে শুনেছি যে, হে কা’য়াব, বাইতুল মুকাদ্দাসের কোথায় আমার নামাজ পড়াকে তুমি উত্তম মনে করো? তিনি বললেন, আপনি যদি আমার মত নিতে চান, তাহলে আমি হলে পাথরের পিছে নামাজ আদায় করতাম। সম্পূর্ণ বাতুল মুকাদ্দাসই তখন আপনার সামনে থাকবে। 

এই কথা শুনে হযরত উমর রা: বললেন, তুমি ইয়াহুদীবাদকে প্রাধান্য দিয়েছো। না। আমি বরং সেখানে নামাজ আদায় করব যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন। তখন তিনি কেবলার দিকে অগ্রসর হয়ে নামাজ আদায় করলেন। 

 

উক্ত হাদীস বর্ণনা উল্লেখ করে, ইবনে কাসীর বলেন, هذا إسناد جيد অর্থাৎ এটি একটি জাইয়্যেদ (ভালো) স্তরের সনদ। হাফেজ জিয়া আল-মাকেদসী তার আল-মুস্তাখরাজ কিতাবে এই মতটি গ্রহণ করেছেন। আমি এই হাদীসের রাবীদের ব্যাপারে আমার মুসনাদে উমর নামক স্বতন্ত্র কিতাবে আলোচনা করেছি। 

[আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ:৭, পৃ: ৫৮ ]

 

বর্তমানে শায়খ আলবানী বা শায়খ শুয়াইব আরনাউত উক্ত বর্ণনাকে দুর্বল বললেও শায়খ আহমাদ শাকের মুসনাদে আহমাদের উক্ত বর্ণনাকে হাসান বলেছেন। সুতরাং ইবনে কাসীর রহ: এর বক্তব্য ও শায়খ আহমাদ শাকেরের বক্তব্য অনুযায়ী হাদীসটি হাসান বা জাইয়্যেদ স্তরের।



 



 





 

এছাড়া ইতবান বিন মালেক রা: এর বিখ্যাত হাদীস যা বোখারী - মুসলিমে রয়েছে এবং এ বিষয়ে খুবই স্পষ্ট হাদীস, সেটিও ইবনে তাইমিয়া খুব সহজেই এড়িয়ে গিয়ে পুরো বিষয়টাকে বিদয়াত বানাবার অপচেষ্টা করেছেন। হাদীসটি দেখে নেয়া যাক,

 

হযরত মাহমুদ ইবনে রবী আল-আনসারী বর্ণনা করেন,

أن عتبان بن مالك كان يؤم قومه وهو أعمى، وأنه قال لرسول الله صلى الله عليه وسلم: يا رسول الله إنها تكون الظلمة والسيل وأنا رجل ضرير، فصل يا رسول الله في بيتي مكانا أتخذه مصلى، فجاءه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: “أين تحب أن أصلي؟” فأشار إلى مكان من البيت، فصلى فيه رسول الله صلى الله عليه وسلم

অর্থ: হযরত ইতবান বিন মালিক রা. একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন। তিনি তার সম্প্রদায়ের ইমাম ছিলেন। তিনি রাসূল স. কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, অনেক সময় পথ অন্ধকার থাকে, বৃষ্টি হলে পানির প্রবাহ থাকে। আর আমি একজন অন্ধ। হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার ঘরের একটি জায়গায় নামায পড়ুন। এটাকে আমার নামাযের জায়গা বানাব। রাসূল স. তার বাড়ী আগমন করলেন এবং বললেন, আমি কোথায় নামায পড়লে তুমি খুশি হবে? তিনি ঘরের একটি জায়গা দেখালেন। রাসূল স. সেখানে নামায আদায় করলেন।[বোখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৩৬]

 

উক্ত হাদীসের মূল শব্দেই নবীজীর নামাজের জায়গাকে পরবর্তীতে নামাজের স্থান হিসেবে নির্ধারণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। নবীজী নিজেই সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন। এমনকি সেই সাহাবীর ঘরে গিয়ে বলেছেন, আমি কোথায় নামায পড়লে তুমি খুশি হবে। সাহাবী যেখানে স্পষ্ট শব্দে বলেছেন যে, হে আল্লাহর রাসূল, আমার ঘরের কোথাও আপনি নামাজ আদায় করুন, যেখানে আমি পরবর্তীতে নামাজ আদায় করব, এক্ষেত্রে নবীজী তাকে বলেননি, তুমি শিরকের দরজা খুলে দিচ্ছো। তোমার এই আবেদন বিদয়াত ও শিরক। তাহলে ইবনে তাইমিয়া এই শিরকের বুঝ কোথায় পেলেন? বিদয়াতের এমন ধারণা কোথায় পেলেন যেখানে খোদ ইবনে উমর রা: এর আমলকে বিদয়াত বানিয়ে দিচ্ছেন?

 

ইবনে তাইমিয়ার পূর্বে উক্ত হাদীসের উপর কাজী ইয়াদ, ইমাম নববী রহ: সহ অসংখ্য আলিম এধরণের বরকত হাসিলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কেউ বিষয়টিকে শিরক কিংবা বিদয়াত বলেননি। 

 

কাজী ইয়াদ রহ. বলেন,

فيه التبرك بالفضلاء، ومشاهد الأنبياء وأهل الخير ومواطئهم، ومواضع صلاتهم، وإجابة أهل الفضل لما رغب إليهم فيه من ذلك” এই হাদীস থেকে বুজুর্গদের থেকে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া নবী ও ওলীগণের  স্মরণীয় স্থান, তাদের হাটা-চলার জায়গা, তাদের নামাজের জায়গা থেকে বরকত হাসিল প্রমাণিত হয়। সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হয় যে, বুজুর্গদের থেকে এভাবে কেউ বরকত লাভ করতে চাইলে তার আবেদনে সাড়া দেয়া উচিৎ। “[ইকমালুল মু’লিম, কাজী ইয়াদ রহ. খ.২, পৃ.৩৫৩]

ইমাম নববী রহ. বলেন,

وفيه التبرك بالصالحين وآثارهم، والصلاة في المواضع التي صلوا بها، وطلب التبريك منه

অর্থ: এই হাদীস থেকে একটি শিক্ষণীয় বিষয় হল, নেককার বুজুর্গদের মাধ্যমে বরকত লাভ। এবং বুজুর্গরা যেখানে নামায আদায় করেছেন সেখানে নামায আদায় করে বরকত অর্জন করা। [শরহু সহীহি মুসলিম, খ.৫, পৃ.১৬১]

 

হাদীস থেকে শুধু নবীজীর নামাজের জায়গার মাধ্যমে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত এমন নয়, বরং খোদ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর পবিত্র কুরআন রাখার জায়গাকে বরকতপূর্ণ মনে করে সেখানে বিভিন্ন আমল করতেন। সহীহ মুসলিমে হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে যেখানে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। 

حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، - وَاللَّفْظُ لاِبْنِ الْمُثَنَّى - قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ مَسْعَدَةَ، - عَنْ يَزِيدَ، - يَعْنِي ابْنَ أَبِي عُبَيْدٍ - عَنْ سَلَمَةَ، - وَهُوَ ابْنُ الأَكْوَعِ أَنَّهُ كَانَ يَتَحَرَّى مَوْضِعَ مَكَانِ الْمُصْحَفِ يُسَبِّحُ فِيهِ ‏.‏ وَذَكَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَتَحَرَّى ذَلِكَ الْمَكَانَ وَكَانَ بَيْنَ الْمِنْبَرِ وَالْقِبْلَةِ قَدْرُ مَمَرِّ الشَّاةِ ‏.‏

 

১০১৮। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ও মুহাম্মদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) ... সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি তাসবীহ ও নফল সালাত (নামায/নামাজ)-এর জন্য মুসহাফ (কুরআন) রাখার স্থান লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতেন । এবং বলতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ স্থানটিত লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতেন। আর মিম্বার ও কিবলার মধ্যকার স্থান একটি ছাগল যেতে পারে এই পরিমাণ ছিল।

 

এই হাদীসে স্পষ্টভাবে কুরআন রাখার জায়গাকে গুরুত্ব দিয়ে সেখানে তাসবীহ ইত্যাদি আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আর এটি নবীজীও করতেন। নবীজীর অনুসরণে হযরত সালামাহ ইবনুল আকওয়া একই কাজ করেছেন। 

উপরে ইবনে তাইমিয়া তার মতের পক্ষে একটি ঐকমত্যের দাবী করেছেন, অন্য দিকে একই বিষয়ে ইমাম নববী রহ: ঠিক উল্টো দাবী করেছেন। উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে ইবনে তাইমিয়ার দাবীর অসারতা এমনিতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। চলুন এ বিষয়ে ইমাম নববী রহ: এর বক্তব্যটি দেখে নেয়া যাক। 

 

মুসলিম শরীফে হযরত সাহাল বিন সা’য়াদ রা: এর একটি লম্বা হাদীস রয়েছে। উক্ত হাদীসের শেষ অংশে রয়েছে, 

 

‏.‏ قَالَ سَهْلٌ فَأَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَئِذٍ حَتَّى جَلَسَ فِي سَقِيفَةِ بَنِي سَاعِدَةَ هُوَ وَأَصْحَابُهُ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ اسْقِنَا ‏"‏ ‏.‏ لِسَهْلٍ قَالَ فَأَخْرَجْتُ لَهُمْ هَذَا الْقَدَحَ فَأَسْقَيْتُهُمْ فِيهِ ‏.‏ قَالَ أَبُو حَازِمٍ فَأَخْرَجَ لَنَا سَهْلٌ ذَلِكَ الْقَدَحَ فَشَرِبْنَا فِيهِ قَالَ ثُمَّ اسْتَوْهَبَهُ بَعْدَ ذَلِكَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَوَهَبَهُ لَهُ

সাহল (রাঃ) বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন ফিরে এসে তার সাহাবীদের সাথে বনু সাঈদার সাকীফায় (বৈধ জায়গায়) উপবেশন করেন। এরপর তিনি সাহলকে বললেন, আমাদেরকে কিছু পান করাও। সাহল বলেনঃ পরে আমি একটি পেয়ালাটি বের করে তাদের সকলকেই তা থেকে পান করিয়েছিলাম। আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, সাহল (রাঃ) আমাদের সামনে পেয়ালাটি বের করলে আমরা তাতে পান করলাম। তারপর উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) তা চাইলে, তিনি তাঁকে সেটি দান করেন। 

মুসলীম: হা: ৫০৬৬

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববীর বক্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম নববী রহ: বলেন,

 

‏ ‏قَوْله : ( فَأَخْرَجَ لَنَا سَهْل ذَلِكَ الْقَدَح فَشَرِبْنَا مِنْهُ , قَالَ : ثُمَّ اِسْتَوْهَبَهُ بَعْد ذَلِكَ عُمَر بْن عَبْد الْعَزِيز فَوَهَبَهُ لَهُ ) ‏ ‏يَعْنِي : الْقَدَح الَّذِي شَرِبَ مِنْهُ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

هَذَا فِيهِ التَّبَرُّك بِآثَارِ النَّبِيّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا مَسَّهُ أَوْ لَبِسَهُ , أَوْ كَانَ مِنْهُ فِيهِ سَبَب , وَهَذَا نَحْو مَا أَجْمَعُوا عَلَيْهِ وَأَطْبَقَ السَّلَف وَالْخَلَف عَلَيْهِ مِنْ التَّبَرُّك بِالصَّلَاةِ فِي مُصَلَّى رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الرَّوْضَة الْكَرِيمَة , وَدُخُول الْغَار الَّذِي دَخَلَهُ النَّبِيّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَغَيْر ذَلِكَ , وَمِنْ هَذَا إِعْطَاؤُهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبَا طَلْحَة شَعْره لِيَقْسِمهُ بَيْن النَّاس , وَإِعْطَاؤُهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِقْوَة لِتُكَفَّن فِيهِ بِنْته رَضِيَ اللَّه عَنْهَا , وَجَعَلَهُ الْجَرِيدَتَيْنِ عَلَى الْقَبْرَيْنِ , وَجَمَعَتْ بِنْت مِلْحَانِ عَرَقَهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , وَتَمَسَّحُوا بِوُضُوئِهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَدَلَّكُوا وُجُوههمْ بِنُخَامَتِهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , وَأَشْبَاه هَذِهِ كَثِيرَة مَشْهُورَة فِي الصَّحِيح , وَكُلّ ذَلِكَ وَاضِح لَا شَكّ فِيهِ

 

অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু এর ব্যবহৃত জিনিস, নবীজী যা স্পর্শ করেছেন, যা পরিধান করেছেন বা নবীজীর সাথে সম্পর্কি জিনিসের মাধ্যমে বরকত অর্জন করার বিষয়টি এই হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। এই বিষয়ে সকলেই ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সালাফ ও খালাফ সকলেই একমত হয়েছেন যে, পবিত্র রওজায় তারা নবীজীর নামাজের জায়গাকে নিজেদের নামাজের জায়গা বানিয়ে বরকত হাসিল করেছেন, নবীজী যে গোহায় প্রবেশ করেছেন সেখানে প্রবেশ করে তারা বরকত হাসিল করেছেন। ইত্যকর অসংখ্য বিষয় রয়েছে। এজাতীয় একটি বিষয় হলো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু তালহা রা: কে নিজের চুল মোবারক দিয়েছিলেন সাহাবীদের মাঝে বন্টনের জন্য। এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কন্যার কাফনের জন্য নিজের পরিধানের কাপড় দিয়েছিলেন। একইভাবে দু’টি কবরের উপর নবীজী দু’টি ডাল দিয়েছিলেন (যাতে কবরের আজাব কমে যায়), হযরত বিনতে মিলহান নবীজীর ঘাম জমা করেছিলেন, নবীজীর ওজুর অবিশষ্ট পানি সাহাবায়ে কেরাম বরকতের জন্য নিজেদের মুখে মেখে নিতেন, একইভাবে নবীজীর নাকের সরদিও সাহাবীরা মুখে মেখে নিতেন। এজাতীয় অসংখ্য বিষয় সহীহ সহীহ হাদীসে রয়েছে যা খুবই প্রসিদ্ধ। এগুলো এতো স্পষ্ট যে, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। 

[শরহে মুসলিম লিন-নববী, ৩৬৫৫ নং হাদীসের ব্যাখ্যা ]

 

উপরে আমরা ইবনে তাইমিয়ার একটি দাবী দেখে এসেছি, যেখানে তিনি বলেছেন, ইবনে উমর রা: ছাড়া কেউ নবীজীর নামাজের জায়গায় নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বরকত হাসিলের চেষ্টা করেননি। অন্য দিকে ইমাম নববী রহ: পূর্ববর্তী ও পরবর্তী (সালাফ ও খালাফ) সকলের ইজমা ও ঐকমত্যের দাবী করেছেন যে, সকলেই নবীজীর নামাজের জায়গাকে বরকত হাসিলের জায়গা বানিয়েছেন। উপরের দলিলের আলোকে প্রিয় পাঠক সিদ্ধান্ত নিবেন, কে তার দাবীতে সঠিক? উপরে যে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: বলেছেন, ইবনে তাইমিয়া তার মতের পক্ষে মিথ্যা ইজমার দাবী করে, বিষয়টি এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি। এধরণের মিথ্যাচার ও প্রতারণা তার জন্য খুব সাধারণ বিষয়। আল-ইয়াজু বিল্লাহ। 

 

ইবনে তাইমিয়া যে ইবনে উমর রা: এর উপর মিথ্যা অভিযোগ করেছেন যে, তিনি ছাড়া কোন সাহাবী নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে নামাজ আদা করেননি, এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করছি। সুনানে নাসায়ীতে রয়েছে, 

 

أَخْبَرَنَا سَعِيدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ الْأُمَوِيُّ، ‏‏‏‏‏‏قال:‏‏‏‏ حَدَّثَنَا أَبِي، ‏‏‏‏‏‏قال:‏‏‏‏ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، ‏‏‏‏‏‏عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، ‏‏‏‏‏‏عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، ‏‏‏‏‏‏أَنَّ أُمَّ سُلَيْمٍ سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْتِيَهَا فَيُصَلِّيَ فِي بَيْتِهَا فَتَتَّخِذَهُ مُصَلًّى، ‏‏‏‏‏‏ فَأَتَاهَا فَعَمِدَتْ إِلَى حَصِيرٍ فَنَضَحَتْهُ بِمَاءٍ، ‏‏‏‏‏‏فَصَلَّى عَلَيْهِ وَصَلَّوْا مَعَهُ

সা’ঈদ ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল উমাবী (রহ.) ..... আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, উম্মু সুলায়ম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আবেদন করলেন, তিনি যেন তার কাছে এসে তার ঘরে সালাত আদায় করেন। তাহলে তিনি ঐ স্থানকে সালাতের স্থান ঠিক করে নিবেন। তিনি তার ঘরে আসলেন, তখন তিনি একটি চাটাইয়ের ব্যবস্থা করলেন এবং পানি দ্বারা তা মুছে ফেললেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ওপর সালাত আদায় করলেন এবং অন্য লোকেরাও তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করলেন।

সুনানে নাসায়ী: হা: ৭৩৮

হযরত উম্মে সুলাইম রা:ও নবীজীকে আবেদন করেছেন তার ঘরে এসে নামাজ আদায় করার জন্য। যেন তিনি নবীজীর আদায় করা জায়গায় নামাজ আদা করতে পারেন। ইতবান বিন মালিক রা: এর মতো নবীজী এখানেও উপস্থিত হয়ে তার ঘরে নামাজ আদায় করেছেন। সাহাবায়ে কেরাও নবীজীর সাথে উপস্থিত ছিলেন। এভাবে সাহাবীদের জামায়াত নিয়ে বিভিন্ন সাহাবীর ঘরে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন যেন সেটিকে পরবর্তীতে নামাজের জায়গা বানান হয়, অথচ ইবনে তাইমিয়া দাবী করছেন, এটি ইবনে উমর রা: ছাড়া কেউ-ই আমল করেননি। অথচ সাহাবীদের জামায়াত নিয়ে এভাবে নামাজ আদায় করার মাধ্যমে বিষয়টি শুরু থেকে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে প্রসিদ্ধ হওয়ার কথা। এই প্রসিদ্ধ বিষয়কে উল্টিয়ে দিয়ে ইবনে উমর রা: এর উপর শিরক-বিদয়াতের অপবাদ দেয়া ইবনে তাইমিয়ার কতো বড় ধৃষ্ঠতা একটু ভেবে দেখুন। 

 

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথে সম্পর্কি জিনিসের মাধ্যমে বরকত হাসিলের এতো বেশি দলিল বর্ণিত আছে যে, কোন অন্ধ বা প্রবৃত্তিপূজারী ছাড়া এটি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। যা ইমাম নববী রহ: স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বিষয়গুলো এতো বেশি প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত যে, এগুলো নিয়ে সংশয় - সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। অথচ নজদী-তাইমীরা এসব দলিলকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বিষয়কে ইয়াহুদী মুসা  ইবনে মাইমুনের শেখান শিরকের দর্শনের কারণে সব কিছুকে শিরকের মাধ্যম বানাবার চেষ্টা করে থাকে। 

 

এই পাহাড় সমান দলিলের বিপরীতে হযরত উমর রা: এর দু’টি বিষয়কে তারা সামনে আনার চেষ্টা করে। যা তাদের পক্ষে কোনভাবেই দলিল নয়। কেউ কেউ বিষয়গুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন, হযরত উমর রা: তাদের মতো নাউজুবিল্লাহ খারেজী চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নবীজীর সাথে সম্পর্কিত বিষয় থেকে বরকত হাসিলের বিরোধী ছিলেন। অথচ উমর রা: এর বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ এর বিপরীত। শুরুতে চলুন, তাদের দেয়া দলিলগুলোর বাস্তবতা দেখে নেওয়া যাক। 

বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছ কাটার ঘটনা

নজদী - সালাফীরা বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে প্রচার করে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যেই গাছের নিচে সাহাবায়ে কেরাম রা: নবীজীর হাতে বাইয়াত নিয়েছিলেন, সেই গাছকে কেটে ফেলার হুকুম দিয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, হযরত উমর রা: নবীজীর সাথে সম্পর্কিত জিনিস থেকে বরকত হাসিলের বিপক্ষে ছিলেন। এভাবে তারা সাধারণ মানুষকে হযরত উমর রা: এর বিষয়ে একটি ভুল ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে। নাউজুবিল্লাহ। অথচ বিষয়টি তারা তাদের আলিমদের গবেষণা থেকেও যাচাই করে না। সেই সাথে এর বিপরীতে যে হযরত উমর রা: থেকে নবীজীর বিভিন্ন বিষয় থেকে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত হলেও সেগুলো গোপন করে থাকে।

বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছকাটার বিষয়ে নাফে রহ: থেকে মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে একটি বর্ণনা রয়েছে। 

নাফে রহ: বলেন,

كَانَ النَّاسُ يَأْتُونَ الشَّجَرَةَ الَّتِي يُقَالُ لَهَا شَجَرَةُ الرِّضْوَانِ فَيُصَلُّونَ عِنْدَهَا قَالَ فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ فَأَوْعَدَهُمْ فِيهَا وَأَمَرَ بِهَا فَقُطِعَتْ

অর্থাৎ শাজারাতুর রিদওয়ান নামে পরিচিত বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছের কাছে এসে মানুষ নামাজ আদায় করত। বিষয়টি হযরত উমর রা: এর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদেরকে সতর্ক করেন এবং গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিলে সেটি কেটে ফেলা হয়। 

[মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, খ: ৫, পৃ: ১৭৫]

 

 বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছ কাটার বিষয়ে উপরের বর্ণনা সম্পর্কে শায়খ আলবানী লিখেছেন, 

 

قُلْتُ رَوَاهُ ابْنُ أَبِيْ شَيْبَةَ أَيْضًا وَرِجَالُهُ ثِقَاتٌ كُلُّهُمْ وَلَكِنَّهُ مُنْقَطِعٌ بَيْنَ نَافِعٍ وَعُمَرَ فَلَعَلَّ الْوَاسِطَةَ بَيْنَهُمَا عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا ثُمَّ اسْتَدْرَكْتُ فَقُلْتُ يُبْعِدُ ذَلِكَ كُلَّهُ مَا أَخْرَجَهُ الْبُخِارِيُّ فِيْ “صَحِيْحِهِ – الْجِهَاد” مِنْ طَرِيْقِ أُخْرُى عَنْ نَافِعٍ قَالَ قَالَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا “رَجَعْنَا مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلْ فَمَا اجْتَمَعَ اثْنَانِ عَلَى الشَّجَرَةِ الَّتِيْ بَايَعْنَا تَحْتَهُ كَانَتْ رَحْمَةً مِّنَ اللهِ” قُلْتُ يَعْنِيْ إِخْفَاءَهَا عَلَيْهِمْ فَهُوَ نَصٌّ عَلَى أَنَّ الشَّجَرَةَ لَمْ تَبْقِ مَعْرُوْفَةَ الْمَكَانِ حَتَّى يُمْكِنَ قَطْعُهَا مِنْ عُمَرَ فَدَلَّ ذَلِكَ عَلَى ضُعْفِ رِوَايَةِ الْقَطْعِ الدَّالِ عَلَيْهِ الْإِنْقِطَاعُ الظَّاهِرُ فِيْهَا نَفْسُهَا وَمِمَّا يَزِيْدُهَا ضَعْفًا مَّا رَوَى الْبُخَارِيُّ فِي “الْمَغَازِيْ” مِنْ “صَحِيْحِهِ” عَنْ سَعِيْدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ “لَقَدْ رَأَيْتُ الشَّجَرَةَ ثُمَّ أَتَيْتُهَا بَعْدُ فَلَمْ أَعْرِفْهَ

অর্থাৎ বর্ণনাটি ইবনে আবি শাইবাও এনেছেন। বর্ণনার সকল রাবী সিকা বা নির্ভরযোগ্য। তবে বর্ণনাটি হযরত উমর রা: ও নাফে রহ: এর মাঝে বিচ্ছিন্ন (মুনকাতি)। সম্ভবত: নাফে রহ: ইবনে উমর রা: এর কাছ থেকে শুনে এটি বর্ণনা করেছেন। তবে এবিষয়ে আরও যাচাই করে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, উক্ত বর্ণনা অন্যান্য বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীত। বিশেষ করে ইমাম বোখারী রহ: বোখারী শরীফের কিতাবুল জিহাদে খোদ নাফে রহ: এর সূত্রে ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা বাইয়াতে রিদওয়ানের ঘটনার পরবর্তী বছর সেখানে গেলে আমাদের কেউ-ই উক্ত গাছটি সুনির্দিষ্ট করতে পারেনি। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ছিলো। 

(শায়খ আলবানী বলেন), গাছটি অপরিচিত হয়ে যাওয়াটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ছিলো। (তবে শায়খ আলবানীর এই ব্যাখ্যা ছাড়াও মূল গাছটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ছিলো এই অর্থ হতে পারে। কারণ, স্ত্রী লিংগ বাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা স্পষ্টভাবে গাছকে নির্দেশ করছে, ইবনে হাজার আসকালানী রহ:ও গাছটি আল্লাহর রহমত ছিল এই ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন।)। বোখারীর এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, গাছটি সাহাবায়ে কেরামের কাছে অপরিচিত হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু গাছ সুনির্দিষ্ট ছিলো না, এজন্য এটি হযরত উমরের কেটে ফেলা সম্ভাবনা থাকে না। সুতরাং এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, গাছ কেটে ফেলার বর্ণনাটি সূত্র বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল। এই বর্ণনাটি দুর্বল হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হলো, বোখারী শরীফের কিতাবুল মাগাজীতে রয়েছে, হযরত সাইদ ইবনুল মুসায়্যাব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি বাইয়াতের রিদওয়ানের গাছটি দেখেছিলাম। পরে যখন আসি এরপর আর গাছটি চিনতে পারিনি।

[তাতহীরুজ সাজিদ মিন ইত্তিখাজিল কুবুর মাসাজিদ, পৃ: ১২৫-১২৭]

 

তাফসীরে ত্ববারীতে ইবনে জারীর ত্ববারী রহ: বুকাইর ইবনুল আশজা থেকে বর্ণনা করেছেন, 

​​وَزَعَمُوْا أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ مَرَّ بِذَلِكَ الْمَكَانِ بَعْدَ أَنْ ذَهَبَتِ الشَّجَرَةُ فَقَالَ أَيْنَ كَانَتْ فَجَعَلَ بَعْضُهُمْ يَقُوْلُ هُنَا وَبَعْضُهُمْ يَقُوْلُ هَهُنَا فَلَمَّا كَثُرَ اخْتِلَافُهُمْ قَالَ سِيْرُوْا هَذَا التَّكَلُّفَ فَذَهَبَتِ الشَّجَرَةُ وَكَانَتْ سَمْرَاءَ إِمَّا ذَهَبَ بِهَا سَيْلٌ وَإِمَّا شَيْءٌ سِوَى ذَلِكَ

অর্থাৎ তারা বলেন, বাইয়াতে রিদওয়ানের ওই জায়গা দিয়ে হযরত উমর রা: গেলে গাছটি সেখানে ছিলো না। সাহাবায়ে কেরামের কেউ বলেন, এখানে ছিলো, কেউ বলেন ওখানে ছিলো। এভাবে তাদের মাঝে মতবিরোধ যখন বাড়তে থাকল হযরত উমর রা: বললেন, তোমরা এই অপ্রয়োজনীয় মতবিরোধ রাখো। গাছটি একটি কাঁটা জাতীয় বাবলা গাছ ছিলো। হয়ত এটি কোন বন্যা বা অন্য কোন কারণে সেখান থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। 

[তাফসীরে ত্ববারী, খ: ১৩, পৃ: ৮৭]

 

ইমাম হাকেম রহ: বলেন,

 

والحديبية بئر وكانت الشجرة بالقرب من البئر، ثم إن الشجرة فُقدت بعد ذلك فلم يجدوها وقالوا إن السيول ذهبت بها، فقال سعيد بن المسيب: (سمعت أبي وكان من أصحاب الشجرة يقول: قد طلبناها غير مرة فلم نجدها) 

 

অর্থাৎ হুদায়বিয়া মূলত: একটি কুপ। বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছটি কুপের কাছেই ছিলো। তবে গাছটি পরবর্তীতে হারিয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম পরে এই গাছটি আর খুঁজে পাননি। তারা বলেছেন, গাছটি বন্যার কারণে বিলীন হয়ে গিয়েছে। হযরত সাইদ ইবনুল মুসায়্যাব রহ: বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, যিনি বাইয়াতে রিদওয়ানের সময় উপস্থিত ছিলেন, আমরা পরবর্তীতে কয়েকবার গাছটি খোঁজার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেটি পাইনি। 

[মা’রিফাতু উলুমিল হাদীস,  পৃ: ১৬২]

 

 

 

মোটকথা বোখারী শরীফের বেশ কয়েকটি বর্ণনা দ্বারা এটি স্পষ্ট যে, বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছ পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম শনাক্ত করতে পারেননি। কেউ কেউ বলেছেন, গাছের জায়গাটি ভুলে গিয়েছি অথবা জায়গার কথা স্মরণ থাকলেও সেখানে গাছটি পরবর্তীতে ছিলো না। বন্যা বা অন্য কোন কারণে গাছটি বিলীন হতে পারে। বোখারীর একটি বর্ণনায় হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা: বলেছেন, তিনি গাছের জায়গাটি নিশ্চিৎভাবে জানেন। বোখারীতে এসেছে,

عن جابر بنِ عبدِ الله رضي الله عنه قال: قال لنا رسولُ اللهِ صلّى الله عليه وسلّم يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ: (( أَنْتُمْ خَيْرُ أَهْلِ الْأَرْضِ ))، وَكُنَّا أَلْفًا وَأَرْبَعَ مِائَةٍ، وَلَوْ كُنْتُ أُبْصِرُ الْيَوْمَ لَأَرَيْتُكُمْ مَكَانَ الشَّجَرَةِ.

 

অর্থাৎ হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়ার বাইয়াতের দিন আমাদেরকে বলেন, তোমরা জমীনের মধ্যে সবার শ্রেষ্ঠ। তখন আমরা এক হাজার চারশত সাহাবী ছিলাম সেখানে। আমি যদি আজ দেখতে পেতাম, তাহলে তোমাদেরকে ওই গাছের জায়গাটি দেখিয়ে দিতাম। 

 

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ ওই জায়গাটি সুনিশ্চিৎভাবে চিনতেন। বক্তব্য থেকে এটাও বোঝা যায় যে, সেসময় সেখানে গাছটি ছিলো না। বন্যা বা অন্য কোন কারণে সেটি সেখানে না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য তিনি গাছ দেখিয়ে দেয়ার পরিবর্তে গাছের জায়গা দেখিয়ে দেয়ার কথা বলেছেন। 

 

উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিচের উপসংহারে উপনীত হতে পারি,

১। বাইয়াতের রিদওয়ানের গাছটি অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম পরবর্তীতে শনাক্ত করতে পারেননি। হয়ত তারা ভুলে গিয়েছিলেন অথবা মূল গাছটি সেখানে ছিলো না। বন্যা বা অন্য কোন কারণে গাছটি বিলীন হওয়াতে তাদের জন্য বিষয়টি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা: এর মতো কিছু কিছু সাহাবী সেই গাছের জায়গাটি নিশ্চিৎভাবে চিনতেন। 

 

২। হযরত নাফে রহ: যেখানে বলেছেন, হযরত উমর রা: গাছটি কেটে ফেলেছেন, এই বর্ণনাতে দু’টি ত্রুটি রয়েছে। ১। বর্ণনাটি মুনকাতি বা সূত্র বিচ্ছিন্ন। হযরত নাফে হযরত উমর রা: কে পাননি। ২। বোখারীর বর্ণনাতে রয়েছে, খোদ হযরত নাফে রহ: ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম বাইয়াতের রিদওয়ানের পরের বছর গিয়ে গাছটি শনাক্ত করতে পারেননি। 

এই দু’টি ত্রুটির কারণে গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি এখানে ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ। হয়ত নাফে রহ: এর বর্ণনাটি সূত্র বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে দুর্বল বলতে হবে। অথবা যদি শক্তিশালী ধরা হয়, তাহলে এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা করতে হবে। এক্ষেত্রে অনেকে বলেছেন, বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছটি অপরিচিত বা বিলীন হয়ে গেলে লোকেরা অন্য কোন গাছকে হয়ত বরকত হাসিলের মাধ্যম বানিয়েছিল। পরে হযরত উমর রা: এই ভুল গাছকে বরকত হাসিলের মাধ্যম বানাবার কারণে সেটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। 

 

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে কোনভাবেই এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, হযরত উমর রা: নবীজীর সাথে সম্পর্কিত বিষয় থেকে বরকত হাসিলের বিরোধিতা করেছেন। উল্টো বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছটির ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উৎসাহ, সেটাকে পরবর্তীতে অনুসন্ধান করা থেকে বোঝা যায়, তারা এই গাছকে বরকতময় মনে করেছিলেন। এবং এর থেকে বরকত হাসিলের চেষ্টা করেছিলেন।  যেমন, হযরত ইবনে উমর রা: এর বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট। তিনি গাছকে রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও গাছটি অপরিচিত হয়ে যাওয়া কিংবা বিলীন হওয়ার কারণে এই গাছ নিয়ে তাদের মাঝে মতবিরোধ হয়। আর হযরত উমর রা: যদি কোন গাছ কেটে থাকেন, সেটা অবশ্যই বাইয়াতে রিদওয়ানের গাছ ছিলো না। অন্য কোন ভুল গাছকে বরকত হাসিলের মাধ্যম বানাবার কারণে কেটে থাকতে পারেন। এরপরও বিষয়টি শক্তিশালী নয়। সুতরাং এই কথা বলার সুযোগ নেই যে, হযরত উমর রা: নবীজীর সাথে সম্পর্কিত বিষয় থেকে বরকত হাসিলের বিরোধী ছিলেন। 

 

হযরত উমর রা: থেকে আরও অসংখ্য জায়গায় নবীজীর বিভিন্ন বিষয় থেকে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত। যেমন, 

 

১। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ভাজন ও বংশের হওয়ার কারণে হযরত আব্বাস রা: কে ওসিলা করে নিজে আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দু’য়া করেছেন। একইভাবে হযরত আব্বাস রা: কে দিয়ে দু’য়া করিয়েছেন। যা বোখারীতে বর্ণিত হয়েছে।

 

বোখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 

عن أنس بن مالك - رضي الله عنه - قال: كنا إذا قحطنا استسقى عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - بالعباس بن عبد المطلب - رضي الله عنه - فقال: اللهم إنا كنا نتوسل إليك بنبينا فتسقينا , وإنا نتوسل إليك بعم نبينا فاسقنا , قال: فيسقون.

অথর্: আমরা যখন অনাবৃষ্টির স্বীকার হতাম, তখন হযরত উমর রা. হযরত আব্বাস রা. এর মাধ‍্যমে বৃষ্টির দুয়া করতেন। হযরত উমর রা. বলেন, অথর্: আমরা যখন অনাবৃষ্টির স্বীকার হতাম, তখন হযরত উমর রা. হযরত আব্বাস রা. এর মাধ‍্যমে বৃষ্টির দুয়া করতেন। হযরত উমর রা. বলেন, হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমরা আমাদের নবী রাসূল স. এর মাধ‍্যমে আপনার কাছে ওসিলা করতাম, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন, এখন আমরা আপনার কাছে আমাদের নবীজীর চাচাকে ওসিলা করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। হযরত আনাস বলেন, এরপর বৃষ্টি হতো। 

বোখারী শরিফ, হাদীস নং ৫১১

এই হাদীস জীবিত ব‍্যক্তির ওসিলার সুস্পষ্ট প্রমাণ। এই হাদীসে হযরত উমর রা. এর দুয়াটি ব‍্যক্তির মাধ‍্যমে ওসিলা প্রমাণ করছে। আর হযরত উমর রা. যখন হযরত আব্বাস রা. কে ওসিলার দুয়া করতে বলছেন, তখন এটি নেককার লোকের কাছে দুয়ার প্রমাণ। মূল কথা হলো, হযরত উমর রা. এই দুয়াটিতে স্পষ্ট ওসীলা রয়েছে। আমাদের কাছে হযরত উমর রা. এর নিজের এই দুয়া যেমন ওসিলার প্রমাণ, একইভাবে হযরত আব্বাস রা. কে দুয়া করার জন‍্য যখন তিনি অনুরোধ করেছেন, সেটাও আরেক প্রকার ওসিলার প্রমাণ। হযরত উমর রা. এর নিজের দুয়াটি লক্ষ‍্য করুন,

اللهم إنا كنا نتوسل إليك بنبينا فتسقينا , وإنا نتوسل إليك بعم نبينا فاسقنا

হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমরা আমাদের নবী রাসূল স. এর মাধ‍্যমে আপনার কাছে ওসিলা করতাম, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন, এখন আমরা আপনার কাছে আমাদের নবীজীর চাচাকে ওসিলা করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। 

উমর রা. এখানে আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন‍্য দুয়া করেছেন। এই দুয়ার মধ্যে হযরত আব্বাস রা. কে ওসীলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হযরত উমর রা. দুয়াটি ব‍্যক্তির মাধ‍্যমে ওসীলার প্রমাণ। এবং হযরত আব্বাস রা.কে দুয়া করতে বলাটা কোন নেককার ব‍্যক্তির মাধ‍্যমে ওসীলার প্রমাণ। এখানে দু’প্রকার ওসিলা এক সাথে হয়েছে। একে এক প্রকার বানাবার চেষ্টার কোন সুযোগ নেই। 

এই হাদীসের অন‍্য বর্ণনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। বণর্নাটি শায়খ নাসীরুদ্দীন আল-বানী তার আত-তাওয়াসসুল কিতাবের ৬২ পৃষ্টায় এনেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন। হযরত আব্বাস রা দুয়া করেছেন,

اللهم إنه لم ينزل بلاء إلا بذنب ، ولم يكشف إلا بتوبة ، وقد توجه القوم بي إليك لمكاني من نبيك ، وهذه أيدينا إليك بالذنوب ونواصينا إليك بالتوبة فاسقنا الغيث .

অথর্: হে আল্লাহ, প্রত্যেক বালা- মুসীবতই গোনাহের কারণে আসে, আর তাওবা ছাড়া এটি দূর হয় না, হে আল্লাহ, আমার জাতি আমার মাধ‍্যমে আপনার স্মরণাপন্ন হয়েছে, কারণ আপনার প্রিয় নবীর সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে (নবীজীর চাচা)। আপনার সামনে আমাদের গোনাহগার হাতগুলো উপস্থিত, আর উপস্থিত আমাদের তাওবার কপাল, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। 

আত-তাওয়াসসুল, পৃ.৬২

হযরত আব্বাস রা. এখানে গুরুত্বপূণর্ কয়েকটি কথা বলেছেন। 

১. তিনি আল্লাহর কাছে দুয়ার সময় বলেছেন, আমার জাতি আমার মাধ‍্যমে হে আল্লাহ আপনার কাছে আবেদন করেছে। এখানে স্পষ্টভাবে হযরত আব্বাস রা. এর ওসিলা প্রমাণিত। হযরত আব্বাস রা. এর এই বক্তব্যের দ্বিতীয় কোন ব‍্যাখ‍্যার সুযোগ নেই।

২.সাহাবায়ে কেরাম রা. হযরত আব্বাস রা. এর ওসিলা গ্রহণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, হযরত আব্বাস রা. এর সাথে রাসূল স. এর আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে। কারণ তিনি রাসূল স. এর চাচা ছিলেন। রাসূল স. এর সাথে এই সম্পর্কের কারণে তার ওসিলা গ্রহণ পরোক্ষভাবে রাসুল স. এর ওসিলা গ্রহণ। হযরত উমর রা. তার দুয়ার মধ্যেও এই সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহ, আমাদের নবীজীর চাচার মাধ‍্যমে আপনার কাছে আবেদন করছি। উমর রা. এর কথা থেকেও সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট। সুতরাং এখানে হযরত আব্বাস রা. ও হযরত উমর রা. এর বক্তব‍্য থেকে স্পষ্ট যে, মূলত: এখানে রাসূল স. এর ওসিলা দিয়ে দুয়া করা হয়েছে। 

সম্পূর্ণ ঘটনা থেকে যেসকল বিষয় প্রমাণিত হয়,

১. হযরত উমর রা. তার দুয়ার মধ্যে হযরত আব্বাস রা. এর ওসিলা করেছেন। এবং পরোক্ষভাবে হযরত আব্বাস রা. এর ওসিলার কারণ হলো, তিনি রাসূল স. এর চাচা। 

২.হযরত আববাস রা. এর নিজের বক্তব‍্য থেকে দিবালোকের ন‍্যায় স্পষ্ট যে, সাহাবায়ে কেরাম তার মাধ‍্যমে আল্লাহর কাছে আবেদন করেছে। হযরত আব্বাস রা. এর স্বীকারোক্তিতে বিষয়টি প্রমাণিত।

৩. হযরত উমর রা. হযরত আব্বাসকে দুয়া করার কথা বলেছেন। এর মাধ‍্যমে কোন নেককার লোকের কাছে দুয়া চাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত।

৪. হযরত উমর রা. ও অন‍্যান‍্য সাহাবী হযরত আব্বাস রা. এর ওসিলা গ্রহণের মূল কারণ হলো, হযরত আব্বাস হলেন রাসূল স. এর আপন চাচা। রাসূল স. এর সাথে তার সম্পর্কের কারণে এই ওসিলা করা হয়েছে। সুতরাং মূল ওসিলা করা হয়েছে রাসূল স. এর মাধ‍্যমে। হযরত আব্বাস রা. এর স্পষ্ট বক্তব‍্য থেকে বিষয়টি প্রমাণিত। হযরত আব্বাস বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমার জাতি আপনার কাছে আমার মাধ‍্যমে আবেদন করেছে, কারণ আপনার নবীর সাথে আমার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে”। হযরত আব্বাস রা. এর এই স্পষ্ট বক্তব‍্য থেকে রাসূল স. এর ইন্তেকালের পরে রাসূল স. এর মাধ‍্যমে ওসিলা দেয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ। 

হযরত উমর রা. এর ঘটনায় মোট তিন প্রকারের ওসিলা প্রমাণিত হয়েছে। 

১. কোন ব‍্যক্তির ওসিলায় দুয়া করা। (বোখারীতে বর্নিত, হযরত উমর রা. এর নিজের দুয়া)।

২.কোন নেককার লোকের কাছে দুয়ার আবেদন করা। (হযরত আব্বাস রা. কে উমর রা. দুয়ার অনুরোধ করেছেন)।

৩. মৃত ব‍্যক্তির ওসিলা দেয়া। (হযরত আব্বাস রা. দুয়ার সময় রাসূল স. এর সাথে তার সম্পর্কের কথা বলে দুয়া করেছেন)

এই তিন প্রকারের ওসিলা উক্ত সহীহ বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে। বক্তব‍্যগুলো সালাফীদের নিজেদের বানানো আকিদার বিরোধী হওয়ার কারণে তারা বিভিন্নভাবে এগুলোর অপব‍্যাখ‍্যা করার চেষ্টা করেছে। সালেহ আল-মুনাজ্জিদ, শায়খ আলবানীসহ অন‍্যান‍্যরা ঘটনাকে বিকৃত করার চেষ্টা করলেও বাস্তবতা সকলের কাছে স্পষ্ট। তারা এক্ষেত্রে একটা ভিত্তিহীন দাবী করেছে যে, হযরত উমর রা. হযরত আব্বাস রা.কে বলেছেন, হে আব্বাস, আপনি উঠুন। আল্লাহর কাছে দুয়া করুন। এই বক্তবে‍্যর মাধ‍্যমে দাবী করেছে যে, এখানে শুধু হযরত আব্বাস রা এর কাছে দুয়া চাওয়া হয়েছে। এছাড়া আর কিছুই নয়। এটা সালেহ আল-মুনাজ্জিদ ও শায়খ আলবানীর স্পষ্ট বিকৃতি। নীচের লিংকে শায়খ মুনাজ্জিদের বিকৃতির নমুনা দেখতে পাবেন, https://islamqa.info/ar/118099

আমরা সহীহ দু’টি হাদীসের আলোকে তাদের এই বিকৃতির জওয়াব উল্লেখ করেছি আল-হামদুলিল্লাহ। হযরত উমর রা. হযরত আব্বাসকে দুয়া করতে বলেছেন। এটা অন‍্য প্রকারের ওসিলার তো বিরোধী নয়। সুতরাং এটা দিয়ে বাকী দুই প্রকারের ওসিলা অস্বীকারের অপচেষ্টা নিতান্ত হাস‍্যকর। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন। 

 

 

২। হযরত আলী রা: এর কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন শুধু এজন্য তিনি নবীজীর বংশের। নবীজীর বংশের বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যেই তিনি এটা করেছেন, যা এ বিষয়ক বর্ণনাগুলোতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

এ বিষয়ক গ্রহণযোগ্য বর্ণনাগুলো বিখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারী তার আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীনে হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে তাখরিজ করেছেন। নিচের দু’পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

 

 

৩। নবীজীর পাশে কবরের জন্য হযরত আয়েশা রা: এর কাছে বার বার অনুরোধ করেছেন। 

 

৪। একদা হযরত উমর রা: মসজিদে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলে হযরত আব্বাস রা: এর ঘরের পরনালার পানি উমর রা: এর গায়ে পড়ে। তিনি কাপড় পরিবর্তন করে নামাজ আদায় করেন এবং উনার পরনালাটি সরিয়ে ফেলতে বলেন। তখন হযরত আব্বাস রা: বলেন, হে উমর, আপনি এই পরনালা সরিয়েছেন অথচ এটি নবীজী নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। একথা শুনে হযরত উমর রা: বলেন, আপনি নিজ হাতে পরনালাটি আগের জায়গায় লাগাবেন। তবে এটা লাগানোর জন্য কোন সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে না। বরং উমরের কাঁধ হবে আপনার সিঁড়ি। (সুবহানাল্লাহ)। তখন হযরত আব্বাস রা: হযরত উমরের কাঁধে চড়ে পরনালাটি আবার আগের জায়গায় রেখে দেন। 

حدثنا أسباط بن محمد حدثنا هشام بن سعد عن عبيد الله بن عباس بن عبد المطلب أخي عبد الله قال كان للعباس ميزاب على طريق عمر بن الخطاب فلبس عمر ثيابه يوم الجمعة وقد كان ذبح للعباس فرخان فلما وافى الميزاب صب ماء بدم الفرخين فأصاب عمر وفيه دم الفرخين فأمر عمر بقلعه ثم رجع عمر فطرح ثيابه ولبس ثيابا غير ثيابه ثم جاء فصلى بالناس فأتاه العباس فقال والله إنه للموضع الذي وضعه النبي صلى الله عليه وسلم فقال عمر للعباس وأنا أعزم عليك لما صعدت على ظهري حتى تضعه في الموضع الذي وضعه رسول الله صلى الله عليه وسلم ففعل ذلك العباس رضي الله تعالى عنه

[মুসনাদে আহমাদ, বর্ণনা: 1793]

 

সুবহানাল্লাহ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনালাটি লাগিয়েছিলেন, এই জন্য হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু পরনালি সেখানেই রেখে দিলেন। আর এই পরনালাটি সেখানে রাখার জন্য তিনি নিজের কাঁধ ব্যবহার করেছেন। কোন সিঁড়ি ব্যবহার করতে চাননি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কী আজমত ও মহব্বত ছিলো হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু। আল-ফাতহুর রব্বানিতে আব্দুর রহমান সায়াতি রহ: বলেন, 

وفيه انقياد الصحابة لما فعله النبي صلى الله عليه وسلم والتبرك بآثاره رضي الله عنهم

অর্থাৎ এই হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন তার প্রতি সাহাবায়ে কেরামের নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং এর মাধ্যমে বরকত হাসিলের বিষয়টিও স্পষ্ট।

[আল-ফাতহুর রাব্বানি, খ: ১৫, পৃ: ১১১ ]

৫। বাইতুল মুকাদ্দাসে নবীজী যেখানে নামাজ আদায় করেছেন সেখানে গিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। যদিও কা’য়াব আল-আহবার র: বাইতুল মুকাদ্দাসের পাথরের কাছে নামাজ আদায়ের পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে ইবনে কাসীর রহ: বাইতুল মুকাদ্দাসের বিজয়ের ঘটনা বিস্তারিত লিখেছেন। সেখানে তিনি হযরত উমর রা: এর আমল তুলে ধরেছেন, 

 

قال الإمام أحمد: حدثنا أسود بن عامر، ثنا حماد بن سلمة عن أبي سنان، عن عبيد بن آدم، وأبي مريم، وأبي شعيب: أن عمر بن الخطاب كان بالجابية فذكر فتح بيت المقدس، قال: قال ابن سلمة: فحدثني أبو سنان، عن عبيد بن آدم سمعت عمر يقول لكعب: أين ترى أن أصلي؟

قال: إن أخذت عني صليت خلف الصخرة، وكانت القدس كلها بين يديك.

فقال عمر: ضاهيت اليهودية، لا ولكن أصلي حيث صلى رسول الله ﷺ، فتقدم إلى القبلة فصلى، ثم جاء فبسط ردائه وكنس الكناسة في ردائه، وكنس الناس.

وهذا إسناد جيد، اختاره الحافظ ضياء الدين المقدسي في كتابه (المستخرج)، وقد تكلمنا على رجاله في كتابنا الذي أفردناه في مسند عمر، ما رواه من الأحاديث المرفوعة، وما روى عنه من الآثار الموقوفة مبوبا على أبواب الفقه، ولله الحمد والمنة.

 

অর্থাৎ ইমাম আহমাদ রহ: বলেন, আমাদের কাছে আসওয়াদ বিন আমের বর্ণনা করেছেন, আমাদের কাছে হাম্মাদ বিন সালামা আবু সিনান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি উবাইদ বিন আদম, আবু মারইয়াম ও আবু শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমর রা: জাবিয়া নামক স্থানে ছিলেন। তখন তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের ঘটনা আলোচনা করলেন। তিনি বলেন, ইবনে সালামা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আবু সিনান উবাইদ বিন আদম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি উমর রা: কে কা’য়াব আল-আহবারকে বলতে শুনেছি যে, হে কা’য়াব, বাইতুল মুকাদ্দাসের কোথায় আমার নামাজ পড়াকে তুমি উত্তম মনে করো? তিনি বললেন, আপনি যদি আমার মত নিতে চান, তাহলে আমি হলে পাথরের পিছে নামাজ আদায় করতাম। সম্পূর্ণ বাতুল মুকাদ্দাসই তখন আপনার সামনে থাকবে। 

এই কথা শুনে হযরত উমর রা: বললেন, তুমি ইয়াহুদীবাদকে প্রাধান্য দিয়েছো। না। আমি বরং সেখানে নামাজ আদায় করব যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন। তখন তিনি কেবলার দিকে অগ্রসর হয়ে নামাজ আদায় করলেন। 

 

উক্ত হাদীস বর্ণনা উল্লেখ করে, ইবনে কাসীর বলেন, هذا إسناد جيد অর্থাৎ এটি একটি জাইয়্যেদ (ভালো) স্তরের সনদ। হাফেজ জিয়া আল-মাকেদসী তার আল-মুস্তাখরাজ কিতাবে এই মতটি গ্রহণ করেছেন। আমি এই হাদীসের রাবীদের ব্যাপারে আমার মুসনাদে উমর নামক স্বতন্ত্র কিতাবে আলোচনা করেছি। 

[আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ:৭, পৃ: ৫৮ ]

 

বর্তমানে শায়খ আলবানী বা শায়খ শুয়াইব আরনাউত উক্ত বর্ণনাকে দুর্বল বললেও শায়খ আহমাদ শাকের মুসনাদে আহমাদের উক্ত বর্ণনাকে হাসান বলেছেন। সুতরাং ইবনে কাসীর রহ: এর বক্তব্য ও শায়খ আহমাদ শাকেরের বক্তব্য অনুযায়ী হাদীসটি হাসান বা জাইয়্যেদ স্তরের।



 

 

 

 

৬। নবীজীর আংটি ও বর্ষা পর্যায়ক্রমে চারও খলিফা সংরক্ষণ করেছেন এবং একজন থেকে আরেকজন সেটি গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে হযরত উমর রা:ও ছিলেন। 

৭। হযরত উমর রা: এর বিখ্যাত দু’য়াটি প্রায় সবারই জানা। তিনি দু’য়া করতেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাত নসীব করুন এবং আপনার রাসূলের শহরে আমার মৃত্যু দান করুন। নবীজীর শহরে ইন্তিকাল করতে চাওয়ার দু’য়াটি নবীজীর প্রতি হযরত উমরের সীমাহীন মহব্বত ও এখানের বরকত হাসিলের প্রমাণ। 

সহীহ বোখারীতে রয়েছে,

عن عمر رضي الله عنه، قال: «اللهم ارزقني شهادة في سبيلك، واجعل موتي في بلد رسولك صلى الله عليه وسلم»

হযরত উমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাত নসীব করুন এবং আমার মৃত্যু আপনার রাসূলের শহরে দান করুন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

বোখারী, হা: ১৮৯০

 

৮। আল-ইসাবাতে ইবনে হাজার আসকালানী রহ: হযরত ফিরাস রা: এর জীবন আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন,

“হযরত সফিয়্যাহ বিনতে বাহরাহ রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার চাচা ফিরাস নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি পাত্রে পানি পান করতে দেখে সেটি তিনি নবীজীর কাছ থেকে হাদিয়া চান। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফিরাসকে পাত্রটি দেন। পরবর্তীতে যখনই হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু আমাদের এখানে আসতেন, তিনি বলতেন, তোমরা নবীজী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পান-পাত্রটি বের করো। আমরা সেটি বের করতাম। তিনি এতে জমজমের পানি নিয়ে পান করতেন এবং তার মুখে ছিটিয়ে দিতেন”।

[আল-ইসাবা, বর্ণনা নং ৬৯৮৭]

এই বর্ণনা থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পানপাত্রের প্রতি হজরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহুর আজমত ও মহব্বতের বহি:প্রকাশ ঘটেছে। সেই সাথে এই পান-পাত্র থেকে বরকত হাসিলের চেষ্টাও করেছেন। এতে তিনি জমজমের পানি পান করতেন এবং সেটি তার মুখে ছিটিয়ে দিতেন। যা পানপাত্র থেকে তাবাররুক হাসিলের স্পষ্ট প্রমাণ। 

 

৯। হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু এর সময় দুর্ভিক্ষ হলে এক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে গিয়ে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার উম্মতের জন্য বৃষ্টির দু’য়া করুন। পরে ঐ ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্ন দেখেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তুমি উমরের কাছে যাও। আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানাও এবং বলো যে, তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে। তাকে বলবে, সে যেন বুদ্ধিমত্তা বজায় রাখে। ঐ ব্যক্তি হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহুকে এই ঘটনা বর্ণনা করলে হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু এটি শুনে কেঁদে ফেলেন। এবং বললেন, হে আল্লাহ, আমি তো আমার সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

উক্ত বর্ণনা থেকেও স্পষ্ট যে, হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু এই ব্যক্তি যে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বৃষ্টির দু’য়ার কথা বলেছেন এবং এর ওসিলায় যে বৃষ্টি হচ্ছে, এটিকে হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু এখানে সমর্থন করেছেন। বিষয়টি যদি হযরত রাজিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নিন্দনীয় হতো তাহলে তিনি অবশ্যই ঐ ব্যক্তিকে সতর্করতে

মজার বিষয় হলো, ইবনে তাইমিয়া হযরত ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহু এর আমলকে শিরকের মাধ্যম বলে উল্লেখ করলেও খোদ ইবনে তাইমিয়ার হাতে চুমু খেয়ে যখন তার ভক্ত-মুরীদান বরকত হাসিলের চেষ্টা করত, তখন কিন্তু সেখানে শিরকের অভিযোগ পাওয়া যায় না। সাহাবায়ে কেরামের আমলের উপর শিরকের অভিযোগের মত ধৃষ্ঠতা অন্যদিকে তার মাধ্যমে বরকত হাসিলের জন্য যখন লোকজন তার হাত চুম্বন করতো তখন সেটাকে অনুমোদন দেয়া কতো বড় দ্বিচারিতা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

ইবনে তাইমিয়ার খুব কাছের ছাত্র আবু হাফস উমর বিন আলী আল-বাজ্জার ইবনে তাইমিয়ার জীবনীর উপর কিতাব লিখেছেন। এর নাম দিয়েছেন, আল-আ'লামুল আলিয়্যাহ ফি মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ। এ কিতাবের ৩৯ পৃষ্ঠায় নিজের উস্তায সম্পর্কে  লিখেছেন,

" অন্তর দৃষ্টিসম্পন্ন যে কেউ তাকে দেখত সাথে সাথে তার হাত ধরে চুমু খেত। এমনকি দুনিয়াদার ব্যবসায়ীরা  শায়খকে সালাম দিতে ও তার থেকে বরকত হাসিলের জন্য তাদের দোকান থেকে বেরিয়ে আসত"।

[আল-আ'লামুল আলিয়্যাহ, পৃ: ৩৯ ]

 

 

 

 

 

 

 

ইবনে তাইমিয়ার আরেকটি বড় ধরণের বিকৃত অপচেষ্টা হলো, হযরত ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহু এর আমলকে বিচ্ছিন্ন একক আমল হিসেবে উল্লেখ করা। অথচ এটি ইবনে তাইমিয়ার সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে অসংখ্য সাহাবী থেকে তাবাররুকের বিষয়টি প্রমাণিত। বিশেষ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে নামাজ আদায় করেছেন সেখানে বরকত হাসিলের জন্য নামাজের বিষয়টিও প্রমাণিত। এটি কখনই ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহু এর একক আমল নয়। অথচ ইবনে তাইমিয়া তার বক্তব্য বোঝানোর চেষ্টা করেছে, যদি খোলাফায়ে রাশেদীন বা বড় বড় সাহাবী এই আমল করতেন তাহলে বোধ হয় তিনি এই আমল মেনে নিতেন। শুধু ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহু এর আমল হওয়ার কারণে মেনে নিতে পারছেন না। এটি আসলে ইবনে তাইমিয়ার অভ্যাসগত চতুরতা ছাড়া কিছুই নয়। ইবনে তাইমিয়ার এধরণের প্রবৃত্তিপূজা ও চতুরতা নিয়ে শায়খ আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারী সুন্দর লিখেছেন। তার ভাষায় বিষয়টি দেখি,

“আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, আমরা দেখি এজাতীয় বিষয়ে ইবনে তাইমিয়া প্রায়ই সাহাবায়ে কেরামের না করাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন। অথচ এটি কোন গ্রহণযোগ্য দলিল নয়। উল্টো দিকে আমরা দেখি, তার কোন মতের বিপরীতে কোন সাহাবী আমল করে থাকলে কিংবা কোন বক্তব্য দিয়ে থাকলে সে তাদের বিরোধিতা করে। এবং কোন ধরণের লজ্জা-শরম ছাড়াই বড় বড় ও শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের অবস্থানকে ভুল সাব্যস্ত করে। যেমন হযরত উমর রা: ও হযরত আলী রা: কে সে ভুল সাব্যস্ত করে। তার কাছে তো সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী কোন তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন বা ইমামের বক্তব্যের সামান্য কোন মূল্যও নেই, যদি সেগুলো তার মতের বিপরীত হয়। সে তার মতের বিপক্ষে এগুলোর কোন মূল্যায়নই করে না। কেউ যদি তার কিতাব ভালো করে অধ্যয়ন করে এবং গ্রহণ করা মতগুলো পর্যালোচনা করে, তাহলে এধরণের আশ্চর্যজনক বিষয়গুলো দেখতে পাবে। এগুলো (প্রবৃত্তিপূজা ও স্বেচ্ছাচারিতা) দেখে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বিস্মিত হোন।”

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন, পৃ: ৪৯ ]

 

পরের পৃষ্ঠায় শায়খ আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারী লিখেছেন, 

“দুর্ভিক্ষের সময় হযরত উমর রা: হযরত আব্বাস রা: কে দিয়ে বৃস্টির দোয়া করিয়েছেন। এই ঘটনাকে ইবনে তাইমিয়া বহু জায়গায় দলিল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। যত্র-তত্র এটা দিয়ে দলিলও দিয়েছে, কেমন যেন এটি একটি অকাট্য দলিল, যেখানে কোন ব্যাখ্যা বা আলোচনার অবকাশ নেই। সে হযত সাহাবায়ে কেরামের আমলকে দলিল মনে করে এজন্য তার এই কাজে হয়ত আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই বিষয়ে উমর রা: এর আমল তার কাছে দলিল কিন্তু তিন তালাকের মাসআলায় হযরত উমর ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত মত তার কাছে দলিল নয়। ইবনে তাইমিয়ার কিতাব পড়লে এসব বিষয় পাঠককে বিস্মিত করে। তাকে আসলে কী বলা উচিৎ? সে কি শরীয়াত নিয়ে তামাশাকারী, খেয়াল-খুশিমত ছাড় প্রদানকারী নাকি স্ববিরোধী? তবে স্ববিরোধী বলাটাই তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও বাস্তব-সম্মত। কারণ সে তার কিতাবে প্রচুর স্ববিরোধিতা করে থাকে। 

 

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন, পৃ: ৫০ ]

 

 

 

 

মোটকথা, এধরণের বাগাড়ম্বর, মিথ্যাচার, দ্বীনকে নিজের খেয়াল-খুশিমত ব্যবহার করা ইবনে তাইমিয়ার স্বভাবগত বিষয়। তালাউব বিদদীন বা দ্বীনকে নিয়ে এধরণের খেলতামাশা করা খুবই ন্যাক্কারজনক বিষয়। বিষয়টি যদি দলিল ভিত্তিক বিপরীত মত পোষণ হতো, তাও একটা ব্যাখ্যার সুযোগ ছিলো। এখানে সরাসরি ইবনে উমর রা: এর কাজকে শিরকের মাধ্যমে বলে দেয়া হচ্ছে নাউজুবিল্লাহ। অথচ একই বিষয় সাহাবায়ে কেরাম নবীজীর মাধ্যমে করিয়েছেন, সেখানে সাহাবায়ে কেরামের বড় একটি জামায়াত উপস্থিত ছিলো। এর মধ্যে হযরত আবু বকর রা:ও ছিলেন। যা নাসায়ীর বর্ণনা থেকে স্পষ্ট। যেটি নবীজীর আমল, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং পরবর্তীতে হযরত উমর রা: এর আমলের মাধ্যমে প্রমাণিত, সেটি কীভাবে হযরত ইবনে উমর রা: এর বিচ্ছিন্ন আমল হিসেবে শিরকের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?

 

নোট: পরবর্তী পর্বে আমরা ইনশা আল্লাহ এ সংক্রান্ত ইবনে তাইমিয়ার দলিলের পর্যালোচনা উল্লেখ করব। 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 65
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 673
আক্বিদা

নবীজীর শানে বিবাহ পূর্ব প্রেমের কাহিনীর মাধ্যমে জঘন্য পর্যায়ের গোস্তাখী

ইজহারুল ইসলাম · 13 জুন, 2023 · 36